কাশীপুর রাজত্বের যোগসূত্র, ২৮৪ বছরের পুজো আজও কৃষির প্রতীক! কুলটির চট্টোপাধ্যায় পরিবারে নবপত্রিকা কেনই বা মহালক্ষ্মী?

দুর্গাপূজা মানেই একচালা প্রতিমা বা মহিষাসুরমর্দিনী দেবীর উগ্রচণ্ডা রূপ। কিন্তু পশ্চিম বর্ধমানের কুলটির মিঠানী গ্রামের চট্টোপাধ্যায় পরিবার ও তাঁদের দৌহিত্রদের পুজো এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী। প্রায় ২৮৪ বছর ধরে এই পরিবারে দেবী দুর্গা পূজিত হন নবপত্রিকার রূপে, যেখানে প্রতিমার কোনও স্থান নেই। এ যেন এক প্রতীকী কৃষির পুজো।
নয় শস্যে আবাহন নয় দেবীর
মিঠানীর চট্টোপাধ্যায় পরিবারের পুজোয় নবপত্রিকাকেই ‘নবপত্রিকাবাসিনী নবদুর্গা’ রূপে আবাহন করা হয়। দুর্গার মধ্যে দিয়ে এখানে ন’জন দেবীকে পূজা করা হয় নয়টি শস্য ও উদ্ভিদের মাধ্যমে। এই নয়টি শস্য একেকজন দেবীর প্রতীক:
কলা রূপে ব্রহ্মাণী
কচু রূপে কালিকা
হলুদ রূপে উমা
জয়ন্তী রূপে কার্তিকী
বেল রূপে শিবানী
ডালিম রূপে রক্তদন্তিকা
অশোক রূপে শোকরহিতা
মান রূপে চামুণ্ডা
ধান রূপে লক্ষ্মী
প্রাচীন ঐতিহ্য মেনে আজও পালকিতে করে গ্রামের পুষ্করিণীতে নিয়ে যাওয়া হয় নবপত্রিকাকে। স্নান করানোর পর তাকে বেদিতে স্থাপন করে শুরু হয় মহাধুমধামের পুজো। পরিবারের সদস্যরা জানান, পুজোর শুরু থেকে যে প্রথা চলে আসছে, তার কখনও অন্যথা করা হয়নি, তাই এখানে প্রতিমা গড়ার পরিকল্পনাও কখনও হয়নি।
পুজোর ইতিহাস ও কৃষিকূলের যোগসূত্র
এই পুজোর ইতিহাসের শিকড় জড়িয়ে আছে পুরুলিয়ার কাশীপুরের রাজত্বের সঙ্গে। জানা যায়, আজ থেকে প্রায় ২৮৪ বছর আগে, রাজা প্রথম গাড়ুর নারায়ণের রাজত্বের সময় কাটোয়া থেকে এসেছিলেন এই পরিবারের প্রথম পুরুষ নীলাম্বর চট্টোপাধ্যায়। তিনি ছিলেন কৃষককূলের মনসবদার।
কৃষকদের মনসবদার হওয়ার কারণেই নীলাম্বরের পরিবার নয়টি শস্য দিয়ে তৈরি নবপত্রিকার মাধ্যমে দুর্গাপূজা শুরু করেছিলেন। সেই সময় কৃষককূল সক্রিয়ভাবে এই পুজোতে অংশ নিতেন এবং শস্য জোগাড় করে আনতেন। পরবর্তীতে কয়লা খনি শিল্পের বিস্তারে চাষবাস প্রায় বন্ধ হলেও, আজও সেই কৃষির প্রতীকী হিসেবেই নবপত্রিকার পুজো হয়ে থাকে।
কালের নিয়মে পরিবার বিভক্ত হয়ে দুটি পুজো শুরু হলেও, দুটি পুজোতেই দেবীরূপে আবাহন করা হয় সেই নবপত্রিকাকেই।
প্রগতির ধারক ও বাহক এই পুজো
চট্টোপাধ্যায় পরিবারের এই পুজো কেবল প্রাচীন ঐতিহ্য বহন করে না, এটি প্রগতিশীল চিন্তাধারারও প্রতীক। দ্বিশতাধিক বছর আগে যখন সমাজে মহিলাদের পুজোর কাজে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা ছিল, তখন এই পরিবার ব্যতিক্রমী হয়ে ওঠে। পালকি বহন করা থেকে শুরু করে পুজোর সমস্ত আয়োজনে মহিলারা অগ্রগণ্য ভূমিকা নিতেন।
বর্তমানেও এই প্রথা অটুট। পরিবারের সদস্য গোলাপী চট্টরাজ জানালেন, “এই পুজোর সমস্ত আয়োজনের নেতৃত্ব আমিই দিই। শুধুমাত্র পুরোহিত এবং ব্রতী ছাড়া পুজোর সমস্ত কিছুই মহিলারা করে।”
পুজোর এই ক’টা দিন বিদেশে থাকা সদস্যরাও গ্রামে ফিরে আসেন। নবপত্রিকার এই পুজোকে কেন্দ্র করে পারিবারিক মন্দির হয়ে ওঠে মিলনক্ষেত্র, যেখানে একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া, আনন্দ ও আড্ডায় মেতে ওঠেন সকলে।