কেন চরম অপমানের শিকার হয়েছিলেন উত্তম কুমার? মহালয়ার ভোরে যে ঘটনা আজও বাঙালির অজানা

আজও মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ ছাড়া বাঙালির মহালয়া অপূর্ণ থেকে যায়। ৯০ বছর ধরে এই অনুষ্ঠান মানুষের মনে এমনভাবে গেঁথে আছে যে ১৯৭৬ সালে তা বদলানোর চেষ্টা করেও চরম ব্যর্থ হয়েছিল। সেই বছর মহালয়ার ভোরে বাঙালিকে নতুন কিছু উপহার দেওয়ার এই ব্যর্থ চেষ্টা যেন মহানায়ক উত্তম কুমারের জীবনের এক কলঙ্কিত অধ্যায়ে পরিণত হয়েছিল।

১৯৭৬ সাল, দেশে তখন জরুরি অবস্থা। দিল্লি বেতার অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নেন, ৪০ বছর ধরে চলে আসা ‘মহিষাসুরমর্দ্দিনী’ অনুষ্ঠানটিতে পরিবর্তন আনা হবে। এর উদ্দেশ্য ছিল নতুন প্রজন্মের জন্য ভিন্ন কিছু পরিবেশন করা এবং জনপ্রিয় শিল্পীদের দিয়ে নতুন করে অনুষ্ঠান সাজানো। কলকাতার রেডিও অফিসের কর্মকর্তারা এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলেও দিল্লির চাপে তা বদলানো সম্ভব হয়নি। খবরটি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কানে পৌঁছালে তিনি নাকি বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি। বরং বলেছিলেন, “নতুনদের তো সুযোগ দিতে হবে।”

বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের জায়গায় চণ্ডীপাঠ করার জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয় তৎকালীন সুপারস্টার উত্তম কুমারকে। তখন ‘সন্ন্যাসী রাজা’ ছবির সাফল্যে চারিদিকে তাঁর জয়জয়কার। প্রথমে উত্তম কুমার এই প্রস্তাবে রাজি হননি। তিনি বলেছিলেন, “দর্শক মেনে নেবে না।” কিন্তু বেতার অফিসের উপরমহলের চাপে এবং সংগীত পরিচালক হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের অনুরোধে ১৫০ টাকা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে তিনি রাজি হন। যদিও অনুষ্ঠানের আগে তিনি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সঙ্গে দেখা করে তাঁর আশীর্বাদ নেন। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ তাঁকে আশ্বস্ত করে বলেন, বাঙালি তাঁকে ঠিক গ্রহণ করবে। এরপর নতুন করে সাজানো হয় অনুষ্ঠান। যার নাম দেওয়া হয় ‘দেবী দূর্গতিহারিণী’। চণ্ডীপাঠ করেন মহানায়ক, গান লেখেন শ্যামল গুপ্ত এবং সঙ্গীত পরিচালনা করেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।

মহালয়ার ভোরে অনুষ্ঠান সম্প্রচার শুরু হতেই যা ঘটল, তা যেন উত্তম কুমারের জীবনের এক বিভীষিকা। বাঙালির আবেগ আর ভালোবাসার প্রতীক বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের বদলে উত্তম কুমারের চণ্ডীপাঠ শুনে দর্শক রাগে ফেটে পড়েন। ক্ষুব্ধ শ্রোতারা একের পর এক ফোন করতে থাকেন আকাশবাণী স্টেশনে। রেডিও অফিসের সামনে মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার মানুষ ভিড় জমায় এবং ইট-পাটকেল ছুঁড়ে প্রতিবাদ জানায়। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, বাধ্য হয়ে আকাশবাণী কর্তৃপক্ষকে সেই বছর ষষ্ঠীর দিন পুনরায় ‘মহিষাসুরমর্দ্দিনী’ সম্প্রচার করতে হয়।

এই ঘটনার পর উত্তম কুমার ভীষণভাবে লজ্জিত ও অপমানিত বোধ করেন। তিনি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কাছে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে বলেছিলেন, তাঁকে জোর করে এই কাজটি করানো হয়েছিল। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কন্যা সুজাতা দেবী জানান, এই ঘটনার পর তাদের বাড়িতে তিন দিন ধরে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ দেখিয়েছিল। উত্তম কুমারও সেই সময় কার্যত গৃহবন্দি হয়ে পড়েছিলেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে, বাঙালির কাছে ‘মহিষাসুরমর্দ্দিনী’ শুধুই একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং এক গভীর বিশ্বাস ও আবেগের প্রতীক।