বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা উত্তাল হলে কলকাতা গর্জে ওঠে, কিন্তু নেপালের বেলায় কেন নীরব?

বাংলাদেশ বা শ্রীলঙ্কার মতো প্রতিবেশী দেশে যখনই কোনো বড় আন্দোলন হয়েছে, কলকাতার প্রতিবাদী জনতা সবসময়ই সরব হয়েছে। মিছিল, সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট, ভিডিও— সব কিছুতেই তাদের সরব উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। অথচ, নেপালে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিক্ষোভ নিয়ে কলকাতার প্রতিবাদী মহল আশ্চর্যজনকভাবে নীরব। কেন এই নীরবতা?

গণআন্দোলন নিয়ে কলকাতার নতুন ভাবনা
সাধারণত, তরুণ প্রজন্মের প্রতিবাদ সবসময়ই কলকাতার মানুষকে আকর্ষণ করেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে আরব বসন্ত পর্যন্ত বহু ঘটনায় কলকাতার প্রতিবাদী মানুষের সংহতি দেখা গেছে। কিন্তু নেপালের ক্ষেত্রে এই ছবিটা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

কলকাতার দুই পরিচিত প্রতিবাদী মুখ সৌম্য মণ্ডল এবং অনির্বাণ দাস এই নীরবতার পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। সৌম্য মনে করেন, বাংলাদেশের সঙ্গে কলকাতার মানুষের সাংস্কৃতিক ও আবেগগত যোগ অনেক গভীর। সেখানকার ছাত্র আন্দোলনে যখন প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল, তখন এ পারের বহু মানুষ নাড়া খেয়েছিল। কিন্তু নেপালের পরিস্থিতি এখনও অনেকের কাছে স্পষ্ট নয়, তাই অবস্থান নিতে সময় লাগছে।

অনির্বাণ দাস আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানের পর যেভাবে চরম ধর্মীয় কট্টরপন্থীরা ক্ষমতা দখল করেছে, সেই অভিজ্ঞতা থেকে কলকাতার প্রতিবাদীরা শিক্ষা নিয়েছে। তারা এমন কোনো আন্দোলনকে সমর্থন করতে চায় না, যা শেষ পর্যন্ত একটি প্রগতিশীল আন্দোলনকে উল্টো পথে নিয়ে যায়।

একসময় বাংলাদেশের আন্দোলনকে সমর্থন করার সময় এ পার বাংলার বামপন্থী দলগুলো মৌলবাদীদের উত্থানের আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল, কিন্তু তখন সেই আশঙ্কায় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে মুক্তচিন্তার মানুষ এবং সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হওয়ার পর অনেকেই উপলব্ধি করেছেন যে, কট্টরপন্থীদের হাতে ক্ষমতা যাওয়া কাম্য ছিল না।

প্রবীণ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রদীপ বসু এই বিষয়টিকে আরও গভীরে ব্যাখ্যা করে বলেন, “আগে মনে করা হতো, গণআন্দোলন মানেই প্রগতিশীল বিষয়। কিন্তু বাংলাদেশ বা ইরানের মতো ঘটনা প্রমাণ করেছে যে, গণআন্দোলনে এমন অনেক শক্তি মিশে থাকে যারা সুযোগ বুঝে সম্পূর্ণ ভিন্ন আদর্শ নিয়ে ক্ষমতা দখল করতে পারে।” তাই নেপাল নিয়ে কলকাতার প্রতিবাদীদের এই সতর্ক অবস্থানকে তিনি ভুল মনে করেন না।

প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক জ়াদ মেহমুদ মনে করেন, বাংলাদেশের সঙ্গে বাঙালির সাংস্কৃতিক, ভাষাগত ও রাজনৈতিক যোগাযোগ অনেক পুরনো। নেপালের বিষয়টি অনেকটা আকস্মিক। বাংলাদেশ বা শ্রীলঙ্কার মতো ঘটনাগুলো ধীরে ধীরে ঘটেছে, যা প্রতিবাদীদের অবস্থান নেওয়ার জন্য যথেষ্ট সময় দিয়েছে।