দেউচা পাঁচামিতে কয়লা তুলবে কে…? রিপোর্টের সুপারিশের পরেই জোর তোড়জোড়! ছয় সংস্থার আগ্রহ

পশ্চিমবঙ্গের ভূখণ্ডে লুকিয়ে থাকা এক বিশাল সম্পদ, দেউচা পাঁচামি কয়লা খনি প্রকল্প, এখন এক নতুন মোড় নিতে চলেছে। এশিয়ার বৃহত্তম এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই কয়লা খনি থেকে উত্তোলন শুরুর জন্য মাইন ডেভেলপমেন্ট অপারেটর (MDO) নিয়োগ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, যা রাজ্যের শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে মনে করা হচ্ছে। আনুমানিক ৩৫,০০০ কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্পে বিশ্বজুড়ে আগ্রহ দেখা গেছে, যার মধ্যে পোল্যান্ডের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাও রয়েছে।

বৈশ্বিক নজর, ছয় সংস্থার আগ্রহ:

পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগম (WBPDC) সূত্রে খবর, এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পে মোট ছয়টি সংস্থা তাদের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এদের মধ্যে রয়েছে ভারতের জেএমএস মাইনিং প্রাইভেট লিমিটেড, গেনওয়েল কমোস্যেলস প্রাইভেট লিমিটেড, মিনোপ ইনোভেটিভ টেকনোলজিস প্রাইভেট লিমিটেড, মিনসল লিমিটেড, মহেশ্বরী মাইনিং প্রাইভেট লিমিটেড। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো, পোল্যান্ডের বৃহত্তম ভূগর্ভস্থ কয়লা খনি সংস্থা জেএসডব্লিউ এস.এ.-এর অংশগ্রহণ, যা প্রকল্পের আন্তর্জাতিক গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

WBPDC-এর চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর, পি বি সেলিম, এই বিষয়ে বলেন, “খনি থেকে কয়লা উত্তোলনের জন্য আন্তর্জাতিক আগ্রহপত্র নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। পোল্যান্ডের একটি সংস্থাসহ মোট ছ’টি সংস্থা তাদের আগ্রহ দেখিয়ে আবেদন জমা দিয়েছে। আমরা দ্রুত বাছাই প্রক্রিয়া চালাচ্ছি এবং খুব তাড়াতাড়ি এই প্রক্রিয়া শেষ করতে পারব বলে আশা করছি।”

জটিল ভূতত্ত্ব, বৈজ্ঞানিক সমাধান:

দেউচা পাঁচামি প্রকল্পের ভূতাত্ত্বিক গঠন বেশ জটিল। তাই খনন কাজ শুরু করার আগে এর সমাধান অপরিহার্য ছিল। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ রক মেকানিক্স একটি বিস্তারিত সমীক্ষা চালিয়ে রিপোর্ট জমা দিয়েছে। WBPDC-এর মাইনিং বিভাগের ডিরেক্টর চঞ্চল গোস্বামী জানান, এই রিপোর্টের সুপারিশ মেনেই খননের পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে। ২০২৪ সালের ২০ ডিসেম্বর ভূ-বৈজ্ঞানিক রিপোর্ট ও খসড়া নোটিস ইনভাইটিং টেন্ডারের সাথে যে গ্লোবাল টেন্ডার ডাকা হয়েছিল, এই আগ্রহপত্র তারই অংশ। তিনি আরও বলেন, “আমরা দরপত্রের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যেতে এই ছয় সংস্থার সঙ্গে কাজ করছি। এর মধ্যে ভারতের একটি খনি সংস্থা এবং পোল্যান্ডের একটি সংস্থা রয়েছে।”

ভবিষ্যতের চাবিকাঠি: কর্মসংস্থান ও জ্বালানি নিরাপত্তা:

WBPDC সূত্রে আরও জানা গেছে, চূড়ান্ত MDO নির্বাচিত হলেই দ্রুত প্রকল্পের কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং পরিবেশগত অনুমোদনের দিকেও নজর দিচ্ছে। দেউচা পাঁচামি প্রকল্পকে কেবল কয়লা উত্তোলন নয়, বরং রাজ্যের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জ্বালানি নিরাপত্তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে প্রশাসন। এই প্রকল্প রাজ্যের বিদ্যুৎ উৎপাদনে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা আনবে এবং শিল্প বিকাশে নতুন গতি সঞ্চার করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

দেউচা পাঁচামি নিঃসন্দেহে পশ্চিমবঙ্গের জন্য একটি ঐতিহাসিক প্রকল্প, যা কেবল খনিজ সম্পদ উত্তোলন নয়, বরং রাজ্যের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকেও নতুন দিশা দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। এই আন্তর্জাতিক আগ্রহ এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রয়োগ প্রকল্পটিকে সাফল্যের দোরগোড়ায় নিয়ে এসেছে।