উদয়পুরের পিচোলা হ্রদের ভৌতিক রহস্য, নটিনী চবুতরার অতৃপ্ত আত্মা আজও কি ঘোরে?

হ্রদের শহর উদয়পুর তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত হলেও, এই শহরের বিখ্যাত পিচোলা হ্রদের গভীরে লুকিয়ে আছে এক প্রাচীন ও গা ছমছমে ভৌতিক গাথা। এই লোককথাটি হ্রদের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত ঐতিহাসিক মঞ্চ ‘নটিনী চবুতরা’কে কেন্দ্র করে প্রচলিত। স্থানীয়দের বিশ্বাস, আজও এক নটিনীর অতৃপ্ত আত্মা হ্রদ পার হওয়ার চেষ্টা করে, যা পর্যটকদের মনে এক অজানা শিহরণ জাগায়।

রাজকীয় চ্যালেঞ্জ ও নটিনীর অঙ্গীকার:

কিংবদন্তি অনুসারে, এক সময় উদয়পুরের মহারাণার দরবারে নৃত্য ও শিল্পের বিশেষ কদর ছিল। দূর-দূরান্ত থেকে শিল্পীরা তাঁদের পারদর্শিতা দেখাতে আসতেন। এমনই এক সময়ে এক অসাধারণ নটিনী দরবারে এসে মহারাণার সামনে এক চমকপ্রদ প্রস্তাব রাখেন। তিনি বলেন, যদি তিনি দড়ির সাহায্যে পিচোলা হ্রদ পার হতে সফল হন, তাহলে পুরস্কারস্বরূপ তাঁকে রাজ্যের অর্ধেক অংশ দিতে হবে। মহারাণা এই প্রস্তাবে রাজি হন।

বিশ্বাসঘাতকতা ও করুণ পরিণতি:

নটিনী হ্রদের এক প্রান্তে একটি দড়ি বেঁধে তার উপর দিয়ে নাচতে নাচতে হ্রদ পার হতে শুরু করেন। তাঁর অতুলনীয় দক্ষতা দেখে উপস্থিত সকলে বিস্মিত হয়ে যান। যখন তিনি প্রায় হ্রদের অর্ধেক পথ অতিক্রম করে ফেলেছিলেন, তখন মহারাণার কিছু ভৃত্য ভয় পেতে শুরু করে। তাদের আশঙ্কা হয় যে নটিনী যদি সত্যিই সফল হন, তাহলে রাজাকে তাঁর প্রতিজ্ঞা রক্ষা করে রাজ্যের অর্ধেক দিয়ে দিতে হবে। এই ভয়ে, বিশ্বাসঘাতকতা করে তারা দড়িটি কেটে ফেলে। সঙ্গে সঙ্গে নটিনী পিচোলা হ্রদের গভীরে তলিয়ে গিয়ে করুণভাবে মৃত্যুবরণ করেন।

অশান্তি ও স্মারক নির্মাণ:

নটিনীর এই মর্মান্তিক মৃত্যুর পর পুরো শহর এক অজানা ভয়ে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। রাজা এবং প্রজা উভয়কেই গভীর অশান্তির সম্মুখীন হতে হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে পণ্ডিতদের পরামর্শ নেওয়া হয়। পণ্ডিতরা এই নিদান দেন যে, নটিনীর আত্মা তখনই শান্তি পাবে যখন তাঁর স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হবে। এর পরই পিচোলা হ্রদের মাঝখানে ‘নটিনী চবুতরা’ নির্মিত হয়।

আজও কি শোনা যায় ঘুঙুরের শব্দ?

স্থানীয়দের দাবি, আজও রাতের বেলায় হ্রদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় অশরীরী ঘুঙুরের শব্দ শোনা যায়। কিছু সাহসী মানুষ নাকি অস্পষ্ট এক নারীমূর্তিকে দড়িতে হ্রদ পার হতেও দেখেছেন। এই রহস্যময় এবং ভয়ঙ্কর গল্পটি আজও উদয়পুরে আসা পর্যটকদের রোমাঞ্চিত করে।

গল্পটি নিছকই একটি লোককাহিনী, না এর পেছনে কোনো সত্য লুকিয়ে আছে, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে, নটিনী চবুতরা আজও পিচোলা হ্রদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সেই প্রাচীন গাথার নীরব সাক্ষী হয়ে রয়েছে। এটি উদয়পুরের সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যের পাশাপাশি তার লোককথার এক রহস্যময় দিককে তুলে ধরে, যা আজও মানুষের মনে কৌতূহল এবং ভয় মিশ্রিত এক অনুভূতির জন্ম দেয়।