‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে আটক বর্ধমানের শ্রমিকেরা মুক্ত, প্রশাসনের হস্তক্ষেপে স্বস্তি, তবুও প্রশ্ন বাঙালি পরিচয় নিয়ে

অবশেষে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ওড়িশায় ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে আটক পূর্ব বর্ধমানের কেতুগ্রামের ১৬ জন পরিযায়ী শ্রমিক মুক্তি পেয়েছেন। গত ৮ জুলাই তাঁদের ওড়িশার বিজয়নগর ও ঝাড়সুগুড়া থানার পুলিশ আটক করেছিল, কারণ তাঁদের বাংলা ভাষায় কথা বলাকে ‘বাংলাদেশি’ হওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা হয়েছিল। কেতুগ্রামের চর সুজাপুর গ্রামের এই ১৬ জন শ্রমিকের আটকে পড়ার খবর তাঁদের পরিবার ও এলাকায় ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল।

পরিযায়ী শ্রমিকদের একটাই দাবি, তাঁদের অপরাধ শুধু একটাই – তাঁরা ভিন রাজ্যে কাজ করতে গিয়েছিলেন এবং তাঁদের পরিচয় ‘বাঙালি’। এই ঘটনার জেরে গ্রামে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। পরিবারের সদস্যরা, বিশেষ করে স্ত্রী ও মায়েরা, প্রশাসনিক জটিলতার কারণে স্বামী বা ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলেন না। আটক ইব্রাহিম শেখের স্ত্রী তারিফুন্নেসা বিবি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “খুবই চিন্তায় আছি। প্রশাসনের কাছে আবেদন সবাই যেন সুস্থভাবে বাড়ি ফিরতে পারে। বাংলা কথা বলার জন্য এরকম হবে কখনও ভাবিনি।”

একই যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন নরিসা খাতুন বিবি। তাঁর ছেলে নুরশেদ শেখ ১৭ বছর ধরে ওড়িশায় পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন এবং তিনিও আটক হয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে নরিসা বিবি বলেন, “আমার ছেলে তো চোর-ডাকাত নয়, খেটে খায়। তাহলে তাকে এইভাবে অপমান করা হল কেন?”

এই শ্রমিকদের অনেকেই দীর্ঘ সময় ধরে ওড়িশায় রাজমিস্ত্রি, ভাঙাচোরা বিক্রি-সহ বিভিন্ন কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। কারো বয়স ৫০ ছাড়িয়েছে, কেউ ২৫ বছর ধরে একই কাজ করছেন। কিন্তু তাঁদের জন্ম সংক্রান্ত কোনও সরকারি শংসাপত্র না থাকায় পুলিশ তাঁদের পরিচয় মানতে চায়নি, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এরপর মৌগ্রাম অঞ্চলের প্রধান, কাটোয়া এবং কেতুগ্রামের বিধায়ক-সহ স্থানীয় প্রশাসনের কাছে বিষয়টি জানানো হয় এবং তাঁদের সক্রিয় হস্তক্ষেপে অবশেষে শ্রমিকেরা মুক্তি পান।

এই ঘটনা আবারও পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং ভিন্ন রাজ্যে তাঁদের পরিচয়ের সংকটকে সামনে নিয়ে এল। প্রশ্ন উঠেছে, কাজের সন্ধানে ভিন রাজ্যে যাওয়া বাঙালি শ্রমিকদের কেবল বাংলা ভাষায় কথা বলার কারণে ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে আটক করা কতটা যুক্তিসঙ্গত। শ্রমিকদের মুক্তি স্বস্তি দিলেও, তাঁদের মনে এই অভিজ্ঞতা এক গভীর ক্ষত রেখে গেল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *