অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের জিআই সেপসিস, এক গুরুতর স্বাস্থ্য সংকট এবং রোগের খুঁটিনাটি

তমলুকের নবনির্বাচিত সাংসদ এবং কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় গত পাঁচদিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তিনি জিআই সেপসিস (Gastrointestinal Sepsis) নামক এক জটিল রোগে ভুগছেন। তাঁর আরোগ্য কামনায় বিজেপি রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার এবং বর্ষীয়ান নেতা দিলীপ ঘোষ হাসপাতালে দেখতে গেছেন। অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের চিকিৎসার জন্য একটি বিশেষ মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। কিন্তু কী এই জিআই সেপসিস? কেন এটি এত বিপজ্জনক? এবং এর চিকিৎসা পদ্ধতিই বা কী? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ইটিভি ভারত যোগাযোগ করেছে বিশিষ্ট গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা: দেবাশিস দত্তের সঙ্গে।

জিআই সেপসিস কী? ডা: দেবাশিস দত্তের ব্যাখ্যা

ডা: দেবাশিস দত্ত এই রোগের বিশদ বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন, “এর পুরো নাম গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সেপসিস। ‘সেপসিস’ মানে হল সংক্রমণ। যখন পরিপাকতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত অঙ্গগুলো, যাদেরকে ‘জিআই অঙ্গ’ বলা হয়, সেই অঙ্গগুলির মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে, তখন তাকে জিআই সেপসিস বলে। অনেক সময় এই সংক্রমণ রক্তের মাধ্যমে সারা শরীরে ছড়িয়ে যেতে পারে, যাকে তখন সেপ্টিসিমিয়া (Septicemia) বলা হয়।”

সংক্রমণের কারণ ও ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী

ডা: দত্ত জানান, শরীরে সংক্রমণ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রবেশ করতে পারে – কখনও জলবাহিত, আবার কখনও খাদ্যবাহিত। যখন শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে, তখনই এই রোগ বাসা বাঁধে। বিশেষ করে যাদের কোমর্বিডিটি (অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী রোগ) থাকে অথবা অপরিণত শিশুদের ক্ষেত্রে এই ধরনের সংক্রমণজনিত রোগের ঝুঁকি বেশি থাকে।

উপসর্গ: কখন সতর্ক হবেন?

চিকিৎসক দেবাশিস দত্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দেন। তিনি বলেন, “এই বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় এই রোগের প্রাথমিক উপসর্গগুলোকে রোগীরা সাধারণ পেট খারাপ ভেবে অ্যান্টাসিড বা মল আটকানোর ওষুধ খেয়ে নেন, যা বিপদ আরও বাড়িয়ে তোলে।” তাঁর মতে, এই রোগের প্রধান উপসর্গ মলের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। ঘন ঘন পাতলা মল হওয়া জিআই সেপসিসের একটি প্রধান লক্ষণ। অনেকের ক্ষেত্রে মলের আগে পেটের নাভির কাছে তীব্র ব্যথা হয়, যা মলত্যাগের পর কমে যায়। কিছু ক্ষেত্রে মলের সাথে রক্তও দেখা যেতে পারে। এই ধরনের কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যাবশ্যক।

চিকিৎসা পদ্ধতি: প্রচলিত ধারণার বাইরে

জিআই সেপসিসের চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে ডা: দেবাশিস দত্ত বলেন, “আমরা দেখি সাধারণ মানুষ পেট খারাপ হলে অ্যান্টিবায়োটিক বা মল আটকানোর ওষুধ খান। কিন্তু আমরা এই রোগের ক্ষেত্রে এই ধরনের ওষুধ একদমই দিই না। বরং, অনেক সময় অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ একেবারেই করা হয় না।” তিনি জানান, রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলে রোগীকে প্রচুর পরিমাণে জল পান করার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে, যদি রোগীর হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হয়, সেক্ষেত্রে শিরায় স্যালাইন জল দেওয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি অ্যান্টি-ডায়রিয়া জাতীয় ওষুধও প্রয়োগ করা হয়।

জিআই সেপসিসের ভয়াবহতা

ডা: দত্তের মতে, জিআই সেপসিসে আক্রান্ত হলে রোগীর জীবন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। সঠিক সময়ে এবং সঠিক চিকিৎসা না হলে এই রোগ প্রাণঘাতীও হতে পারে। তাই, পরিপাকতন্ত্র সংক্রান্ত কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া অত্যন্ত জরুরি।