কমছে ট্যুরিস্ট, পকেটে পড়ছে টান! কলকাতার ঐতিহ্য ‘ঘোড়ার গাড়ি’র ভবিষ্যৎ কোন দিকে?

আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে কলকাতার রাজপথে ঘোড়ার গাড়ির চল। ব্রিটিশ শাসনের সূত্র ধরে এই ঐতিহ্যবাহী সওয়ারির শুরু। সেই সময় থেকে আজ অবধি, কলকাতার ময়দানে কিছু পরিবার এই পেশাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়া আর সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় ফিকে হয়ে আসছে তাদের স্বপ্ন।

চার পুরুষের ঐতিহ্য, এখন অনিশ্চিত
উমেশ জাসওয়াল, এই পেশার এক চতুর্থ প্রজন্মের বাহক। তাঁর ঠাকুরদা ও বাবার পর তিনিও এই পারিবারিক ব্যবসা সামলাচ্ছেন। ছোটবেলা থেকেই ঘোড়াকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কলা রপ্ত করেছেন তিনি। বাবার হাত ধরেই ঘোড়ার সওয়ারির জগতে তাঁর প্রবেশ। বিহারে তাঁদের আদি বাড়ি হলেও, খিদিরপুরের একটি ভাড়া বাড়িতেই তাঁদের পাকাপাকি ঠিকানা। বিহার থেকে ঘোড়া কিনে এনেই কলকাতায় এই ব্যবসা শুরু করেছিলেন তাঁর পূর্বপুরুষরা। প্রতিদিন সকালে ঘোড়া নিয়ে ময়দানের দিকে যাত্রা শুরু হয়, আর সন্ধ্যায় ফেরা।

পুঁজি ও প্রতিবন্ধকতা
এই ব্যবসার মূল পুঁজি হল ঘোড়া কেনা, যার জন্য লাখ খানেক টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। এছাড়াও ঘোড়ার খাবার ও পরিচর্যার খরচ তো আছেই। একসময় উমেশ প্রতিদিন প্রায় ১০০০ টাকা আয় করতেন। তবে এখন সেই আয়ে ভাটা পড়েছে।

উমেশ জানাচ্ছেন, কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ের হামলার পর দেশের নিরাপত্তা কড়াকড়ি হওয়ায় বিদেশী পর্যটকদের আনাগোনা কমে গেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের পর্যটকেরা, যারা ময়দানে ঘোড়ায় চড়তে ভালোবাসতেন, তাদের সংখ্যা প্রায় নেই বললেই চলে। এখন তাদের একমাত্র ভরসা স্থানীয় পর্যটকরা।

ময়দানের ঘোড়া, কলকাতার আবেগ
রবিবারের ছুটির দিন বা বিকেলের দিকে অনেক অভিভাবক তাদের বাচ্চাদের নিয়ে ময়দানে আসেন। বেশিরভাগ বাচ্চারাই ঘোড়ার পিঠে চড়তে ভালোবাসে, অনেকে তো নিজ হাতে ঘোড়াকে নিয়ন্ত্রণ করারও চেষ্টা করে। এছাড়াও, ময়দান মানেই আড্ডা, প্রেম আর আজকালকার নতুন ট্রেন্ড – ফটোশ্যুট। অনেক যুগল তাদের বিশেষ মুহূর্তকে আরও রঙিন করে তুলতে ঘোড়ায় চড়ে ছবি তোলেন, যা উমেশদের আয়ের আরেকটি উৎস।

তবে দিনের শেষে, এই আয় দিয়ে সংসার চালানোটা খুবই কঠিন। বাড়িতে উমেশের দুই সন্তান, মা, বাবা আর স্ত্রী। তাঁর চোখে এক স্বপ্ন, “ছেলে দুটোকে পড়াশোনা করাচ্ছি, ওরা আমার স্বপ্ন। আমি চাই না ওরা ঘোড়া চড়িয়ে খাক, আমি চাই ওরা ঘোড়া চড়ুক।” উমেশের এই কথাগুলো শুধু তাঁর একার নয়, কলকাতার সেইসব শেষ টাট্টু সওয়ারিদের প্রতিচ্ছবি, যারা একটি ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন, কিন্তু সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে ক্রমশ ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন।