বিরিয়ানি থেকে শুরু করে ইডলি—ভারতীয় নয় এই সব খাবার, দেখেনিন তালিকা?

ভারতীয় খাবারের সুখ্যাতি বিশ্বজুড়ে থাকলেও, আমরা যে সব খাবারকে ‘ভারতীয়’ বলে জানি, তার অনেকগুলোর উৎস কিন্তু এ দেশে নয়। ইতিহাস ও বাণিজ্যের হাত ধরে বিভিন্ন সময়ে বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাবে এই খাবারগুলো ধীরে ধীরে ভারতীয় রন্ধনশৈলীর অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এই তালিকায় বিরিয়ানি, শিঙাড়া, ইডলি, পনির এবং পাও ভাজির মতো জনপ্রিয় পদগুলো সবার উপরে।
বিরিয়ানি: মধ্যপ্রাচ্যের সুগন্ধ
ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় খাবার বিরিয়ানি, যা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভিন্ন স্বাদে তৈরি হয় (যেমন কলকাতার আলু দেওয়া বিরিয়ানি)। তবে এর জন্মস্থান মধ্যপ্রাচ্য বা পারস্য। ফারসি ভাষায় ‘বিরিয়ান’ শব্দের অর্থ ‘রোস্ট’ বা ‘ভাজা’। মুঘল সম্রাট শাহজাহানের স্ত্রী মুমতাজ মহল-এর হাত ধরে বিরিয়ানি ভারতে জনপ্রিয়তা লাভ করে বলে প্রচলিত। সে সময় এই খাবারে পারস্য ও আফগানি উভয় সংস্কৃতির স্বাদই মিশে ছিল। অন্য একটি মতে, আফগানিস্তান থেকে কাজাখস্তান হয়ে বিরিয়ানি ভারতে আসে। বিরিয়ানির পাশাপাশি কাবাবও এসেছে পারস্য থেকে, যা ইরানে গ্রিল করা মাংস খাওয়ার প্রচলন থেকে তুরস্ক হয়ে ভারতে আসে।
শিঙাড়া: মধ্য এশিয়ার মোড়ক
জনপ্রিয় মুখরোচক শিঙাড়া নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। ধারণা করা হয়, এর জন্ম মধ্য এশিয়ায়, আবার কারো মতে, পারস্য থেকে এটি ভারতে এসেছে। দিল্লির সুলতানদের রাজত্বকাল থেকেই শিঙাড়া খাওয়ার চল ছিল, তবে তখন এর নাম ছিল ‘সাম্বুসাক’। কেউ কেউ মনে করেন, আমিরশাহী, পর্তুগাল ও ব্রাজিলের খাস্তা খাবারের সমন্বয়ে ভারতে শিঙাড়ার আধুনিক রূপ তৈরি হয়েছে।
ইডলি: ইন্দোনেশিয়ার প্রভাব
দক্ষিণ ভারতের জনপ্রিয় প্রাতরাশ ইডলিকেও ভারতীয় খাবার বলা যায় না। এটি আদতে ইন্দোনেশিয়ার খাবার। অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতকে সে দেশে ‘কেডলি’ নামে একটি খাবার জনপ্রিয় ছিল, যা থেকেই ইডলি ভারতে আসে। আবার কারো মতে, সৌরাষ্ট্র থেকে আসা ব্যবসায়ী-বণিকদের মাধ্যমে ইডলি এই দেশে আসে।
পনির: পর্তুগিজ আবিষ্কারের ছোঁয়া
নিরামিষ খাবারের অনুষঙ্গ পনিরও আসলে ‘ভারতীয়’ নয়। ষোড়শ শতকে উত্তর ভারতে শাসনকারী পারস্য ও আফগান শাসকরা ছাগল বা ভেড়ার দুধ ব্যবহার করে পনির খেতেন। তবে বর্তমানে পনির তৈরির পদ্ধতিটি পর্তুগিজদের আবিষ্কার। সপ্তদশ শতাব্দীতে বাংলায় বসবাসকারী পর্তুগিজরাই দুধ কাটানোর জন্য সাইট্রিক অ্যাসিড ব্যবহার শুরু করেন। এখনও ছানা তৈরির জন্য লেবুর রস ব্যবহার করা হয়, এবং বাংলা থেকেই ছানা ও পনির তৈরির এই পদ্ধতি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
পাও ভাজি: মুম্বাইয়ের আদলে পর্তুগিজ রুটি
মুম্বাইয়ের অত্যন্ত বিখ্যাত খাবার পাও ভাজি, যা বলিউডের পরেই এই শহরের আরেকটি পরিচয়। তবে এই খাবারও মুম্বাইয়ের নিজস্ব নয়। ভাস্কো দা গামা যখন ভারতের পশ্চিম উপকূলে আসেন, তখন তার সঙ্গে এসেছিল পর্তুগিজ ব্রেড রোল। এই পাউরুটি থেকেই পাও ভাজির জন্ম বলে অনেকে মনে করেন। আমেরিকান সিভিল যুদ্ধের সঙ্গেও এই খাবারের নাম জড়িয়ে আছে। পর্তুগিজদের মধ্যে পাউরুটির সঙ্গে সবজি খাওয়ার প্রচলন ছিল, যা আজকের মুম্বাইয়ের জনপ্রিয় পাও ভাজির ভিত্তি স্থাপন করেছে।
এভাবেই বিভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনে ভারতীয় রন্ধনশৈলী আজকের বৈচিত্র্যময় রূপ লাভ করেছে, যেখানে ‘বিদেশী’ খাবারগুলো এখন ‘দেশি’ পরিচয়েই বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করেছে।