“কেন দিঘার মন্দিরকে ধাম বলা হচ্ছে?”-দিঘায় জগন্নাথ মন্দির নিয়ে তদন্তে ওড়িশা সরকার

পশ্চিমবঙ্গের দিঘায় নবনির্মিত জগন্নাথ মন্দিরের নামকরণ এবং সেখানে স্থাপিত প্রতিমার কাঠ নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক এবার সরকারি পর্যায়ে পৌঁছে গেল। ‘জগন্নাথধাম দিঘা’ নাম দেওয়া এবং পুরীর জগন্নাথ বিগ্রহের নবকলেবর তৈরির অতিরিক্ত নিমকাঠ দিয়ে দিঘার মন্দিরের প্রতিমা তৈরি হয়েছে বলে ওঠা অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরকারিভাবে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে ওডিশা সরকার। এই বিতর্ক রাজ্যের জগন্নাথ ভক্ত ও সাধারণ মানুষের ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করেছে বলে ওডিশার তরফে জানানো হয়েছে।

এই বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে শ্রী জগন্নাথ টেম্পল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (SJTA)-কে। ওডিশার আইনমন্ত্রী পৃথ্বীরাজ হরিচন্দন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, এসজেটিএ-র মুখ্য প্রশাসক অরবিন্দকুমার পদী-কে বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা জানার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আইনমন্ত্রী বলেন, এই বিতর্ক ওডিশার মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে। মন্দির নির্মাণ এবং প্রাণপ্রতিষ্ঠা অনুষ্ঠানে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের সেবায়েতদের উপস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ বৃদ্ধি পেয়েছিল, যা এই তদন্তের সিদ্ধান্তের একটি কারণ। তদন্তের উদ্দেশ্য হলো, এই ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনে রাজ্য সরকারের অনুমতি নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ উপযুক্ত ব্যবস্থা ও শাস্তির ব্যবস্থা করা।

এসজেটিএ-কে দেওয়া ওডিশা সরকারের নির্দেশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘যদি এই ঘটনায় কেউ দোষী প্রমাণিত হন বা জেনেশুনে এমন কাজ করে থাকেন, তবে রাজ্য সরকারের অনুমতি নিয়ে শাস্তির বিধান দেওয়া যেতে পারে।’ নির্দেশ অনুযায়ী, দিঘার মন্দিরের নামকরণ নিয়েও তদন্ত করা হবে।

বিতর্কের মূলে রয়েছে ‘ধাম’ শব্দটি। সারা দেশে পুরী, দ্বারকা, বদ্রীনাথ এবং রামেশ্বরম – এই চারটি স্থানকে ধর্মীয় এবং ঐতিহাসিক ভাবে ‘চার ধাম’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। হিন্দু ধর্মতত্ত্বে ‘ধাম’ শব্দটি কেবল একটি উপাধি নয়, এটি পবিত্র তীর্থস্থানকেও বোঝায় যার গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য রয়েছে। ওডিশার পণ্ডিতদের একাংশ ও সাধারণ ভক্তদের প্রশ্ন, এই প্রেক্ষাপটে দিঘার মন্দিরকে কেন ‘জগন্নাথধাম’ বলা হচ্ছে? তাদের মতে, এটি ভক্তদের বিভ্রান্ত করতে পারে এবং পুরীর অনন্য পরিচিতিকে খাটো করতে পারে।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ওডিশার বালি-শিল্পী, পদ্মশ্রী পুরস্কারপ্রাপ্ত সুদর্শন পট্টনায়ক সম্প্রতি সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝিকে একটি চিঠি লিখে এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি ওডিশা সরকারকে অনুরোধ করেছেন, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে যেন প্রয়োজনে সংশোধনের পদক্ষেপ করা হয়। পাশাপাশি অভিযোগ উঠেছে যে, ‘জগন্নাথ ধাম ও সমুদ্র দেখার জন্য পুরীতে যাওয়ার দরকার নেই’ — এমন আপত্তিকর স্লোগান ব্যবহার করা হচ্ছে, যা পুরীর ঐতিহ্য ও গুরুত্বের প্রতি অসম্মানজনক।

ওডিশা সরকারের এই তদন্ত নির্দেশের কোথাও পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের কথা উল্লেখ করা হয়নি। এই বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা এখনই কোনও মন্তব্য করতে চাইছেন না। রাজ্য প্রশাসনের এক আমলা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ওডিশা সরকার কী তদন্ত করছে বা কেন করছে, সে বিষয়ে আমাদের কাছে কোনও সরকারি তথ্য নেই। ফলে আমরা এই বিষয়ে আগ বাড়িয়ে কিছু বলতে বা ব্যাখ্যা দিতে অপারগ।”

দিঘায় প্রায় ২২ একর জমিতে আনুমানিক ২৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই জগন্নাথ মন্দিরটিকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ধর্মীয় ও পর্যটন গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। কিন্তু নামকরণ ও প্রতিমার কাঠ নিয়ে বিতর্ক এবার বিষয়টি আরও জটিল করে তুলল। ওডিশা সরকারের তদন্তের পর কী রিপোর্ট আসে এবং তার ভিত্তিতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সেটাই এখন দেখার।