‘মাধ্যমিকে প্রথম অদৃত’ শুনেই খুশিতে চোখে জল রায়গঞ্জের ছেলের! ফাঁস হল তার সাফল্যের রহস্য

দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রকাশিত হলো পশ্চিমবঙ্গ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল ২০২৫, আর রাজ্য মেধা তালিকার একেবারে শীর্ষে নাম লেখালো উত্তর দিনাজপুর জেলার রায়গঞ্জের ছেলে অদৃত সরকার। রায়গঞ্জ করোনেশন হাইস্কুলের এই ছাত্র ৭০০-এর মধ্যে রেকর্ড সংখ্যক ৬৯৬ নম্বর পেয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেছে, যা শতকরা ৯৯.৪৩ শতাংশ। তার এই অসাধারণ কৃতিত্ব রাজ্যজুড়ে আলোড়ন ফেলেছে।

প্রথম হওয়ার খবরটা অদৃতের কাছে ছিল এক অসাধারণ চমক! তার নিজের মুখেই শোনা গেল সেই মুহূর্তের অনুভূতি। অদৃতের কথায়, “মাধ্যমিকে ভালো ফল হবে সেই আশা তো ছিলই। এমনকি মেধা তালিকার প্রথম দশে থাকতে পারব, সেটাও আশা করেছিলাম। কিন্তু, একেবারে প্রথম হব, এতটা আশা সত্যিই করিনি।” অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত এই ফলাফল জানার পরেই খুশিতে তার চোখ ভিজে আসে, আবেগে কেঁদে ফেলেছিল অদৃত।

ভবিষ্যৎ নিয়ে তার লক্ষ্য স্থির। আগামীদিনে সে চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করতে চায়। তবে অন্য কোনো বিষয়ে যদি তার আগ্রহ বাড়ে, তাহলে সেই বিষয় নিয়েও পড়াশোনা করার ব্যাপারে তার ইচ্ছে রয়েছে বলে জানিয়েছে অদৃত, কারণ সে বিশ্বাস করে শেখার কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডি নেই।

অদৃত বরাবরই পড়াশোনায় ভালো। পরিবারের সদস্যদের কথায়, তাকে কোনোদিনই পড়াশোনার জন্য আলাদা করে বলতে হয়নি। পড়াশোনার প্রতি তার ছিল এক স্বাভাবিক আগ্রহ এবং ভালোবাসা। বই পড়তে সে খুব ভালোবাসে, কেবল পাঠ্যবই নয়, বিষয় সম্পর্কিত পড়াশোনার বাইরেও নানা ধরনের বই পড়তে ভালোবাসে অদৃত, যা তার জানার পরিধিকে বাড়িয়েছে। তবে আট-দশটা সাধারণ ছেলের মতো খেলাধূলায় অবশ্য তার তেমন কোনো আগ্রহ নেই। শুধুমাত্র পড়াশোনার পোকা নয়, তার মেধার পরিচয় পাওয়া গেছে আরও অনেক ক্ষেত্রে। সম্প্রতি জেলাস্তরে একটি কুইজ প্রতিযোগিতায় সে জয়ী হয়েছিল, যা তার প্রখর বুদ্ধি ও সাধারণ জ্ঞানের প্রমাণ দেয়।

পড়াশোনার বিষয় হিসেবে বিজ্ঞান পড়তে বেশি ভালোবাসে অদৃত এবং বায়োলজি তার প্রিয় বিষয়। বিজ্ঞানের প্রতি তার এই ঝোঁকই হয়তো ভবিষ্যতে তাকে চিকিৎসক হওয়ার পথে চালিত করবে। তবে সে কেবল বিজ্ঞানমনস্কই নয়, পড়াশোনার পাশাপাশি সাহিত্যের প্রতিও তার গভীর টান রয়েছে। বই পড়া বাদ দিয়ে অন্য সময়ে সুযোগ পেলেই সে সাহিত্যের অন্যান্য বই পড়ে, যা তার মন ও কল্পনাকে সমৃদ্ধ করে। প্রথম হওয়ার ঘটনায় অদৃত নিজেও অত্যন্ত আপ্লুত এবং আনন্দিত।

শুক্রবার সকাল ৯টায় যখন মধ্যশিক্ষা পর্ষদের সভাপতি রামানুজ গঙ্গোপাধ্যায় সাংবাদিক বৈঠক করে ফলাফল ঘোষণা শুরু করেন, তখন থেকেই রায়গঞ্জের বাড়িতে ছিল টান-টান উত্তেজনা। পরিবারের সকলের চোখ ছিল টিভির পর্দায়। যখন পর্ষদের সভাপতি মেধা তালিকার প্রথম স্থানাধিকারী হিসেবে অদৃতের নাম ঘোষণা করলেন, তখনই বাড়ির সকলের মুখে ফুটে উঠল বাঁধভাঙা হাসি, আনন্দ আর গর্ব।

অদৃতের বাবা অমিত কুমার সরকার একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মী। ছেলের এই অসাধারণ ফলাফলে তিনি খুবই খুশি হয়েছেন। তাঁর কথায়, “আমার ছেলে আমাদের এবং রায়গঞ্জের নাম উজ্জ্বল করেছে, এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে!।” মা সীমা সরকার একজন গৃহবধূ। ছেলের সাফল্যে তিনি এতটাই আনন্দিত যে, তার মুখে যেন কোনো কথা সরছিল না, আবেগে তিনি কিছু বলার ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলেন না।

প্রথম হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই অদৃতের বাড়িতে একের পর এক ফোন আসা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন, অনেকেই বাড়িতে এসে তাকে উপহার দিয়ে যাচ্ছেন। পরিবারের লোকজন মিষ্টিমুখ করিয়ে তার সাফল্য উদযাপন করেছেন। ভবিষ্যত পরিকল্পনার বিষয়ে অদৃত আবারও জানায় যে, মেডিক্যাল নিয়ে তার পড়াশোনার প্রবল ইচ্ছে রয়েছে, তবে অন্য বিষয়ে আগামিদিনে আগ্রহ তৈরি হলে সেই পথেও যেতে পারে।

তার এই ভালো ফলাফলের জন্য সে তার বাবা-মা ও দিদির অবদানকে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে, যারা সবসময় তার পাশে ছিলেন এবং তাকে উৎসাহিত করেছেন। পাশাপাশি স্কুলের শিক্ষকদেরও অক্লান্ত পরিশ্রম ও সঠিক পথনির্দেশের জন্য অত্যন্ত কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে অদৃত।

নিজের পড়াশোনার পদ্ধতি নিয়ে অদৃত জানায়, সে বাধা ধরা নিয়ম মেনে পড়াশোনায় বিশ্বাসী নয়। রুটিন করে পড়ার চেয়ে যে কোনো সময়ে যেটা ইচ্ছে সেটাই সে পড়েছে। অর্থাৎ, সে প্রচলিত কঠোর রুটিনের চেয়ে নিজের আগ্রহ এবং সুবিধা অনুযায়ী পড়াশোনা করেছে। শিক্ষকদের সাহায্য না পেলে এত ভালো ফল সম্ভব হতো না বলেও সে জানায়।

উল্লেখ্য, এবারের মাধ্যমিকের পরীক্ষা হয়েছিল ১০ ফেব্রুয়ারি। পরীক্ষা শেষ হওয়ার মাত্র ৭০ দিনের মাথায় ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে, যা পর্ষদের দ্রুততার পরিচয় দেয়। এবছর মাধ্যমিকের পাশের হার ছিল ৮৬.৫৭ শতাংশ। মেধাতালিকায় প্রথম দশে মোট ৬৬ জন স্থান পেয়েছে। পাশের হারে শীর্ষে প্রথম পূর্ব মেদিনীপুর, দ্বিতীয় স্থানে কালিম্পং এবং তৃতীয় স্থানে কলকাতা।

রায়গঞ্জের অদৃত সরকারের এই সাফল্য কেবল তার ব্যক্তিগত কৃতিত্ব নয়, এটি তার পরিবার, স্কুল এবং এলাকার জন্যও এক বিশাল গর্বের বিষয়। সীমিত সময়ে নিজের মতো করে পড়াশোনা করেও সর্বোচ্চ স্থান অর্জন করাটা আগামী প্রজন্মের জন্য এক বিরাট অনুপ্রেরণা।