‘কোনও ব্রান্ড নয়, চিকিৎসকদের উচিত জেনেরিক ওষুধের নাম লেখা’, কড়া নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের

সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যখাতে খরচ কমানোর দিকে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে চলেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি এক কড়া নির্দেশিকায় জানিয়েছে যে, এখন থেকে চিকিৎসকরা কোনো নির্দিষ্ট বা নামিদামি ব্রান্ডের ওষুধ নয়, শুধুমাত্র ওষুধের জেনেরিক বা সাধারণ নামই প্রেসক্রাইব করতে পারবেন। রাজস্থানে ইতিমধ্যেই এই নির্দেশ কার্যকর রয়েছে, এবং শীর্ষ আদালত এবার সেই নির্দেশ গোটা দেশেই বহাল করার ব্যাপারে জোর দিয়েছে এবং এই বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে পরামর্শ দিয়েছে।
কেন এই নির্দেশ? অনৈতিক ব্যবসার উপর রাশ টানতে চাইছে সুপ্রিম কোর্ট
ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলি তাদের ব্যবসার প্রসারের জন্য নানা ধরনের অনৈতিক পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকে – এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। রোগীদের উপর নির্দিষ্ট বা অপেক্ষাকৃত দামি ব্রান্ডের ওষুধ চাপিয়ে দেওয়ার জন্য চিকিৎসকদের নানাভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়, দেওয়া হয় নানা ধরনের উপঢৌকন বা ‘ঘুষ’। এই প্রবণতা রুখতেই এবং চিকিৎসা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে এই কড়া অবস্থান নিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত।
চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্রান্ডেড বনাম জেনেরিক ওষুধের বিতর্ক পুরনো। জেনেরিক ওষুধ হলো সেইসব ওষুধ, যার রাসায়নিক গঠন ব্রান্ডেড ওষুধের মতোই, কার্যকারিতা একই, কিন্তু দাম অনেক কম হয় কারণ এর প্রস্তুতকারক সংস্থাকে গবেষণার জন্য আলাদা করে খরচ করতে হয় না এবং ব্র্যান্ডিংয়ের খরচও কম থাকে। ব্রান্ডেড ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলি মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করে তাদের ব্রান্ডের প্রচার করে এবং চিকিৎসকদের মাধ্যমে তা রোগীদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করে।
এই অনৈতিক কার্যকলাপ বন্ধ এবং চিকিৎসকদের শুধুমাত্র জেনেরিক ওষুধের নাম লেখার জন্য একটি নির্দিষ্ট নিয়ম চালু করার আবেদন জানিয়েই একটি জনস্বার্থ মামলা বা পিটিশন দাখিল করা হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টে।
বিচারপতি সন্দীপ মেহতা, বিচারপতি বিক্রম নাথ এবং বিচারপতি সঞ্জয় কারোলের ডিভিশন বেঞ্চে এই মামলার শুনানি চলছিল। শুনানি চলাকালীন বিচারপতি সন্দীপ মেহতা পর্যবেক্ষণ করে বলেন, “যদি এই নির্দেশ সমগ্র দেশে চালু হয়, তবে এটি স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং সাধারণ মানুষের জন্য এক বিরাট পরিবর্তন আনবে। রোগীদের চিকিৎসার খরচ অনেক কম হবে এবং ওষুধের অযৌক্তিক ব্যবহারও কমবে।”
শীর্ষ আদালতে দাখিল করা পিটিশনে স্পষ্টভাবে অভিযোগ করা হয়েছিল যে, ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলি তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থে চিকিৎসকদের নানা ধরনের ঘুষ বা উপঢৌকন দেয় যাতে তারা রোগীদের নির্দিষ্ট কোনও দামি ওষুধ বা অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত ওষুধ প্রেসক্রাইব করেন। এর ফলে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের চিকিৎসা খরচ আকাশছোঁয়া হয়, তেমনই অনেক ক্ষেত্রে ওষুধের অতিরিক্ত বা ভুল প্রয়োগে রোগীর শরীরে খারাপ প্রভাব পড়ে বা ওষুধের উপর অপ্রয়োজনীয় নির্ভরশীলতা বেড়ে যায়। পিটিশনে জোরালোভাবে বলা হয় যে, চিকিৎসকদের এই বিনামূল্যে নানা জিনিস বা উপঢৌকন দেওয়ার জন্য ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলিকেই আইনত দায়বদ্ধ করা উচিত এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
এই মামলার আগের শুনানিতেই ফেডারেশন অব মেডিক্যাল অ্যান্ড সেলস রিপ্রেজেনটেটিভ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়ার (FMRAI) তরফে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য আদালতের সামনে পেশ করা হয়েছিল। জানানো হয়েছিল যে, একটি নির্দিষ্ট সময়ে বহুল ব্যবহৃত একটি ব্রান্ডেড ওষুধ, ডোলো ৬৫০-এর প্রস্তুতকারক সংস্থা নাকি শুধুমাত্র চিকিৎসকদের উপঢৌকনের পিছনেই প্রায় ১০০০ কোটি টাকা খরচ করেছে। এই তথ্য ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির অনৈতিক কার্যকলাপের ভয়াবহতা তুলে ধরে।
শীর্ষ আদালত তার পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট করে দেয় যে, এই অনৈতিক প্রভাব খাটানোর মূল সমস্যাটির সমাধান তখনই সম্ভব, যখন চিকিৎসকদের শুধুমাত্র ওষুধের জেনেরিক নাম প্রেসক্রাইব করার জন্য বাধ্য করা হবে। যদি শুধুমাত্র জেনেরিক ওষুধের নাম লেখা হয়, তবে রোগীরা ফার্মেসী থেকে তাদের পছন্দসই বা সহজলভ্য যেকোনো ব্রান্ডের ওষুধ কিনতে পারবেন, যা তাদের খরচ কমাতে সাহায্য করবে। এর ফলে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলির ব্রান্ড প্রচার এবং চিকিৎসকদের প্রভাবিত করার প্রবণতাও হ্রাস পাবে। রাজস্থানেও ইতিমধ্যেই এই নিয়ম চালু রয়েছে এবং তার ইতিবাচক প্রভাবও লক্ষ্য করা গেছে।
সুপ্রিম কোর্টের এই যুগান্তকারী পরামর্শ যদি সারাদেশে কার্যকর হয়, তবে তা একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের চিকিৎসার খরচ কমাতে এক বিশাল ভূমিকা পালন করবে, তেমনই ওষুধের অযৌক্তিক ব্যবহার এবং ফার্মাসিউটিক্যাল সেক্টরের অনৈতিক ব্যবসার উপর রাশ টানতে পারবে। এটি দেশের স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে একটি স্বচ্ছ এবং রোগী-কেন্দ্রিক পরিবেশ তৈরি করার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।