বিদেশ থেকে এল ৩৭ হাজার কোটি টাকা! শুক্রে কতটা লাভ করল শেয়ার বাজার? জেনেনিন

সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ভারতীয় শেয়ার বাজার বিনিয়োগকারীদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে, যা পূর্ববর্তী দিনের অস্থিরতা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। দীর্ঘ মে দিবসের ছুটির কারণে দালাল স্ট্রিট বন্ধ ছিল এবং তার ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ বুধবার, সেনসেক্স প্রায় ৪০০ পয়েন্টের বেশি পড়ে গিয়েছিল, যা বাজারে কিছুটা ভীতির সঞ্চার করেছিল। কিন্তু শুক্রবার, লেনদেন শুরু হতেই সেই আশঙ্কার মেঘ অনেকটাই কেটে যায়।
এদিন বাজার খোলার সঙ্গে সঙ্গেই সূচকের এক অভূতপূর্ব উত্থান দেখা যায়। বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক সেনসেক্স এক ধাক্কায় প্রায় ৯০০ পয়েন্ট লাফিয়ে ওঠে, যা বাজার খোলার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ তৈরি করে। মনে হচ্ছিল যেন আগের দিনের সমস্ত ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার তোড়জোড় চলছে। তবে এই উর্ধ্বমুখী প্রবণতা সারাদিন ধরে একই গতিতে থাকেনি। বেলা বাড়ার সাথে সাথে সূচকে কিছুটা পতন লক্ষ্য করা যায়। বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, সূচক যখন দ্রুত গতিতে ৯০০ পয়েন্টের একটি উচ্চতায় পৌঁছে যায়, তখন অনেক বিনিয়োগকারী নিজেদের লাভ ঘরে তোলার অর্থাৎ ‘প্রফিট বুকিং’-এর সুযোগটি কাজে লাগান। এর ফলেই বেলা ১১টা নাগাদ সেনসেক্স তার সর্বোচ্চ স্তর থেকে নেমে ৬৩৭ পয়েন্টের আশেপাশে এসে দাঁড়ায়। ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের সূচক নিফটি ৫০-এর ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি দেখা যায়। সপ্তাহের শেষ ট্রেডিং দিনে এটি নিজের সর্বোচ্চ ২৬৮ পয়েন্ট স্পর্শ করার পর ধীরে ধীরে কমে ১৩১ পয়েন্টের কাছাকাছি নেমে আসে। দিনের শেষে বাজার ইতিবাচক অবস্থানেই শেষ হলেও, দিনের সর্বোচ্চ মাত্রা থেকে কিছুটা নিচে নেমে আসে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন হঠাৎ করে দালাল স্ট্রিট এমন গতি পেল? এর পেছনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ চিহ্নিত করেছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
প্রথম এবং অন্যতম প্রধান কারণ হলো আমেরিকার শেয়ার বাজার ওয়াল স্ট্রিটের পুনরুদ্ধার। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধ ঘোষণার পর বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য নীতি নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব আমেরিকার বাজারেও পড়েছিল। ওয়াল স্ট্রিট কিছুটা ধুঁকতে শুরু করেছিল সেই সময়। তবে পরিস্থিতি এখন অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে এবং মার্কিন শেয়ার বাজার পুনরায় নিজের ছন্দে ফিরছে। যেহেতু বিশ্ব অর্থনীতি এখন অনেক বেশি সংযুক্ত, তাই আমেরিকার বাজারের এই ইতিবাচক প্রভাব এশিয়ার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলির উপরেও পড়েছে এবং ভারতীয় বাজারও এর ব্যতিক্রম নয়। ওয়াল স্ট্রিটের সুস্বাস্থ্য এশিয়ার বিনিয়োগকারীদেরও নতুন করে উদ্যমী করে তুলেছে।
দ্বিতীয়ত, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্যও দালাল স্ট্রিটের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করেছে। তিনি বলেছেন যে, ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্যিক স্তরে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক চলছে। এর মাধ্যমে খুব শীঘ্রই হয়তো দুই দেশের মধ্যে একটি বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে। এই ধরনের একটি চুক্তি উভয় দেশের জন্যই লাভজনক হতে পারে এবং এর ফলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সহজ হবে। এই সম্ভাবনাই ভারতীয় শেয়ার বাজারে আস্থা বাড়াতে সাহায্য করেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা এবং অগ্রগতির সম্ভাবনা সবসময়ই বাজারের জন্য ইতিবাচক বার্তা দেয়।
তৃতীয় এবং সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পুনরায় ভারতীয় বাজারে ফিরে আসা। পূর্ববর্তী সময়ে, যখন বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য যুদ্ধ এবং অন্যান্য ভূ-রাজনৈতিক কারণে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তখন অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারী ভারতীয় বাজার থেকে নিজেদের পুঁজি তুলে নিয়েছিলেন। এর ফলে ভারতীয় শেয়ার বাজার ক্ষতির মুখে পড়েছিল এবং সূচক অনেকটা নেমে গিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ায় এবং ভারতের অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তি মজবুত থাকায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আবারও ভারতীয় বাজারে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হচ্ছেন। বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিদেশি বিনিয়োগের প্রত্যাবর্তন বাজারের সেই ক্ষতগুলিতে ঔষধের মতো কাজ করেছে। পরিসংখ্যান বলছে, গত মাত্র ১১ দিনের মধ্যেই বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীরা (FPIs) ভারতীয় বাজারে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার বিশাল বিনিয়োগ করেছেন। এই বিপুল পরিমাণ পুঁজি বাজারের তারল্য বাড়াতে এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আস্থা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করেছে, যা শুক্রবারের এই ইতিবাচক গতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
সংক্ষেপে বলা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারের ইতিবাচক পরিস্থিতি, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্যিক চুক্তির সম্ভাবনা এবং বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগের শক্তিশালী প্রত্যাবর্তনের মতো কারণগুলি সম্মিলিতভাবে সপ্তাহের শেষ ট্রেডিং দিনে ভারতীয় শেয়ার বাজারকে সুস্থ এবং গতিশীল করে তুলতে সাহায্য করেছে। যদিও দিনের সর্বোচ্চ স্তর থেকে কিছুটা পতন হয়েছে প্রফিট বুকিংয়ের কারণে, সামগ্রিকভাবে বাজার একটি শক্তিশালী ইতিবাচক বার্তা নিয়েই সপ্তাহ শেষ করেছে।