পহেলগাঁও হামলায় পাক হ্যান্ডলারদের জড়িত থাকার প্রমাণ, অত্যাধুনিক অস্ত্র ও ডিজিটাল পদচিহ্ন পাকিস্তানের দিকে

কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ের নৈসর্গিক বৈসারন উপত্যকায় সম্প্রতি সংঘটিত ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা পূর্বপরিকল্পিত এবং অত্যন্ত প্রশিক্ষিত জঙ্গিদের কাজ বলেই মনে করছেন তদন্তকারীরা। ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং প্রাণে বেঁচে ফেরা ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই হামলায় প্রশিক্ষিত হ্যান্ডলারদের (Pakistani handlers) দ্বারা অত্যাধুনিক সামরিক-গ্রেডের অস্ত্র এবং অত্যাধুনিক যোগাযোগ ডিভাইস ব্যবহারের স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে। গোয়েন্দা সূত্রগুলি দৃঢ়ভাবে পাকিস্তান-ভিত্তিক অপারেটিভদের সাথে এই হামলার সরাসরি যোগসূত্র স্থাপন করেছে। এমনকি, ডিজিটাল পদচিহ্নগুলি (Digital footprints) পাকিস্তানের মুজাফফরাবাদ এবং করাচিতে অবস্থিত নিরাপদ আশ্রয়স্থলের দিকে নির্দেশ করছে বলেই চাঞ্চল্যকর খবর সামনে এসেছে।

এদিকে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে জঙ্গি সংগঠন রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট (টিআরএফ), যা পূর্বেও কাশ্মীরে একই ধরনের সন্ত্রাসী হামলার দায়ভার নিয়েছে। টিআরএফ এই হত্যাকাণ্ডকে কাশ্মীরে জনসংখ্যা পরিবর্তনের (জনতত্ত্ব বিদ্যা) প্রতিশোধ হিসেবে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তাদের দাবি, ২০১৯ সালে ৩৭০ ধারা বাতিলের পর ভারতীয় নাগরিকদের পুনর্বাসনের প্রতিক্রিয়ায় এই হামলা চালানো হয়েছে।

তদন্তে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। জানা গেছে, লস্কর-ই-তৈবার (Lashkar-e-Taiba) মতো কুখ্যাত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলি পাকিস্তানের অভ্যন্তর থেকে নিয়মিত আর্থিক সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং কৌশলগত সমর্থন লাভ করে আসছে। পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের (পিওকে) বিভিন্ন শিবিরে এই সন্ত্রাসবাদীদের উন্নত সামরিক প্রশিক্ষণ এবং লজিস্টিক সহায়তা প্রদান করা হয়। সূত্র মারফত খবর, গোপন অর্থ লেনদেনের জন্য হাওয়ালা চ্যানেল এবং ফ্রন্ট এনজিও-গুলিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। তদন্তকারী সংস্থাগুলির নজরদারি এবং যোগাযোগের উপর ভিত্তি করে ধারাবাহিকভাবে পাকিস্তানি হ্যান্ডলারদের সাথে এই হামলার যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, সন্ত্রাসবাদে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সম্পৃক্ততার বিষয়টি অস্বীকার করার একটি কৌশল হিসেবে টিআরএফ একটি প্রক্সি সংগঠন হিসেবে কাজ করছে মাত্র।

সূত্রের খবর অনুযায়ী, মঙ্গলবারের এই ভয়ানক হামলায় প্রায় চারজন সন্ত্রাসী সরাসরি জড়িত ছিল, যার ফলে ২৬ জন নিরীহ পর্যটক প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অধিকাংশই স্থানীয় বাসিন্দা নন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত এবং বিদেশের নাগরিকও ছিলেন। জঙ্গিদের মধ্যে দুজনকে পশতুভাষী বিদেশী সন্ত্রাসী বলে মনে করা হচ্ছে, যারা স্থানীয় কাশ্মীরি আতঙ্কবাদীদের সহায়তায় এই নৃশংস হামলা চালিয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, সন্ত্রাসীরা প্রায় ২০ মিনিট ধরে তাঁদের হাতে থাকা একে-৪৭ রাইফেল থেকে কমপক্ষে ৫০ রাউন্ড গুলি চালায়। শুধু তাই নয়, তারা লোকজনের কাছে গিয়ে তাদের নাম ও ধর্ম জিজ্ঞাসা করে। যারা হিন্দু বলে শনাক্ত হন, তাঁদেরকে ঠান্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়। নিরাপত্তা সংস্থাগুলি ইতিমধ্যেই হামলায় জড়িত সন্ত্রাসীদের স্কেচ এবং একটি ছবি প্রকাশ করেছে। তদন্তকারীরা এই আক্রমণকারীদের আসিফ ফৌজি, সুলেমান শাহ এবং আবু তালহা নামে চিহ্নিত করেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এই হামলাকারীরা নিষিদ্ধ ঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠন লস্কর-ই-তৈবার একটি ছদ্মবেশী সংগঠন টিআরএফ-এর সদস্য।

উল্লেখ্য, বৈসরন তার মনোরম দৃশ্য এবং বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য প্রায়শই “মিনি সুইজারল্যান্ড” নামে পরিচিত। পহেলগাঁও থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই স্থানটি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় গন্তব্যস্থল। বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে এখানে পর্যটকদের ব্যাপক সমাগম দেখা যায়। এমন একটি শান্ত ও মনোরম স্থানে এই নৃশংস হামলা সকলকেই স্তম্ভিত করেছে। এই হামলার পর এলাকায় রাত থেকে চিরুনি তল্লাশি চালাচ্ছে নিরাপত্তা বাহিনী। ভারতীয় সেনাবাহিনীর চিনার কর্পস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, “হামলার জন্য দায়ী সন্ত্রাসীদের খুঁজে বের করার জন্য তদন্ত অভিযান চলছে এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে সবরকম প্রচেষ্টা করা হচ্ছে।” ইতিমধ্যেই পুরো জম্মু ও কাশ্মীর জুড়ে জারি করা হয়েছে হাই অ্যালার্ট। তবে, শুধুমাত্র তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করাই যথেষ্ট নয়। ভবিষ্যতে এই ধরনের হামলা প্রতিরোধ করতে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার আরও জোরদার করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে, সন্ত্রাসবাদের মূল কারণগুলো খুঁজে বের করে তা সমাধানের জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করাও অপরিহার্য। প্রসঙ্গত, এই ঘটনায় বহু পর্যটকের প্রাণহানি এবং তাঁদের পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। নিহতদের মধ্যে বিভিন্ন রাজ্যের মানুষ এবং বিদেশি নাগরিকও ছিলেন, যা আন্তর্জাতিক স্তরেও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।