রোমে পরমাণু চুক্তি নিয়ে আমেরিকা-ইরান আলোচনা, মধ্যস্থতায় ওমান

ইতালির রাজধানী রোমে ফের একবার পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনায় বসেছে আমেরিকা ও ইরান। এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে আমেরিকার বিশেষ দূত স্টিভ বিকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি অংশগ্রহণ করছেন। দুই দেশের মধ্যে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে এটি দ্বিতীয় দফার আলোচনা।
ইরানের পরমাণু অস্ত্রভান্ডার: ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি
আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অতীতে মন্তব্য করেছিলেন যে ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে এবং এটি বিশ্বের জন্য একটি বড় হুমকি। তিনি ইরানকে পারমাণবিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করার জন্য জোরালো আহ্বান জানিয়েছিলেন, অন্যথায় এমন আক্রমণের হুঁশিয়ারিও দিয়েছিলেন যা আগে কখনও ঘটেনি। জবাবে ইরানও তাদের পারমাণবিক সক্ষমতার কথা উল্লেখ করে পাল্টা জবাব দেওয়ার কথা বলেছিল। এই পরিস্থিতিতে, দুই দেশ এখন দ্বিতীয় দফার আলোচনায় বসেছে, যেখানে ওমান সরকার মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে বলে জানা গেছে।
রাশিয়ার সমর্থন চাইল ইরান
আমেরিকার সঙ্গে আজকের এই দ্বিতীয় দফার আলোচনার পূর্বে, ইরান তাদের দ্রুত বর্ধনশীল পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আমেরিকার সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির জন্য রাশিয়ার সমর্থন চেয়েছিল। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি গত সপ্তাহে ওমানে অনুষ্ঠিত প্রাথমিক আলোচনা সম্পর্কে মস্কোতে তার রুশ counterpart সের্গেই ল্যাভরভকে বিস্তারিত জানিয়েছেন।
রোমে আলোচনায় আব্বাস আরাকচি
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি তার টেলিগ্রাম সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে জানিয়েছেন যে তিনি আলোচনার জন্য রোমে পৌঁছেছেন। মস্কোতে গত সপ্তাহে তিনি বলেছিলেন, “ওয়াশিংটন যতক্ষণ বাস্তববাদী থাকবে, ততক্ষণ আমেরিকার সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব বলে ইরান বিশ্বাস করে।”
তেহরানের সংযত প্রত্যাশা
কিছু ইরানি কর্মকর্তা মনে করছেন যে আমেরিকার আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শীঘ্রই প্রত্যাহার করা হতে পারে। তবে তেহরান দ্রুত চুক্তির প্রত্যাশা কিছুটা কমানোর চেষ্টা করছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি সম্প্রতি আলোচনা প্রসঙ্গে এক পরোক্ষ মন্তব্যে বলেছেন, “আমি অতিরিক্ত আশাবাদীও নই, আবার হতাশও নই।”
ইরানের পরমাণু অস্ত্র নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান
শুক্রবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প বলেছিলেন, “আমি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রধারী হতে বাধা দেওয়ার পক্ষে। তাদের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকতে পারে না। আমি চাই ইরান একটি ভালো, সমৃদ্ধ এবং দুর্দান্ত দেশ হোক।”
ইরানের উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা
২০১৮ সালে তার প্রথম মেয়াদে ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে এসে তেহরানের উপর পুনরায় অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন। বর্তমানে, পুনরায় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি ইরানের উপর পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে জোর দিচ্ছেন।
সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে উদ্বেগ
আমেরিকা মনে করে, ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের পরিমাণ অনেক বেশি। ওয়াশিংটনের আশঙ্কা, এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে পারে। তাই আমেরিকা ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদন বন্ধ করতে বদ্ধপরিকর।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কি বন্ধ করবে ইরান?
অভিযোগ রয়েছে, ইরান ২০১৫ সালের চুক্তির সীমা অতিক্রম করে বিপুল পরিমাণে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে। তবে ইরান এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ইরানের এক বেনামী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২০১৫ সালের চুক্তিতে ইরান কখনোই তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলি সরিয়ে ফেলা, সমৃদ্ধকরণ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ কমানোর বিষয়ে সম্মত হয়নি।
ইরানের কাছে ৮টি পরমাণু বোমা তৈরির মতো ইউরেনিয়াম মজুদ
বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কাছে ৮ থেকে ১০টি পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য যথেষ্ট ইউরেনিয়াম মজুদ রয়েছে। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিতে ইরানকে তাদের ইউরেনিয়াম মজুদ ৯৮% কমানোর এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা ৩.৬৭%-এর মধ্যে রাখার কথা বলা হয়েছিল, যা পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সমৃদ্ধকরণের মাত্রার তুলনায় অনেক কম।
পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির মেয়াদ
২০১৫ সালে আমেরিকা, চিন, রাশিয়া, জার্মানি ও ব্রিটেন সহ বিশ্বের ছয় পরাশক্তি ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। এই চুক্তিতে ইরানে পারমাণবিক পরীক্ষা চালানো নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং এটি ১৫ বছরের জন্য কার্যকর ছিল। তবে ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তি থেকে আমেরিকাকে প্রত্যাহার করে নেন এবং ইরানের উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।