“ওয়াকফ সম্পত্তি সাধারণ মুসলিমদের কাজে লাগে না”-দাবি মুসলিম নেতাদের

সংশোধিত ওয়াকফ আইনের বিরোধিতা করে যাঁরা বিক্ষোভ আন্দোলনে নামছেন, ওয়াকফ সম্পত্তি তাঁদের কোনও কাজে লাগে না — এমন বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন তৃণমূলের রাজ্য সংখ্যালঘু সেলের সাংগঠনিক সম্পাদক তথা সর্বভারতীয় হাজি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুখতার আলি।

তাঁর স্পষ্ট যুক্তি, ‘সাধারণ মুসলিমের কোনও উপকারে লাগে না ওয়াকফ সম্পত্তি। এত ওয়াকফ সম্পত্তি থাকা সত্ত্বেও রাজ্যে একটিও স্কুল, কলেজ বা হাসপাতাল তৈরি হয়নি।’ মুখতার আলির আরও অভিযোগ, ‘বিপুল পরিমাণ ওয়াকফ সম্পত্তি বেদখল হয়ে রয়েছে। যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, সেই শাসকদলের লোকজনই তার ক্ষমতা ভোগ করেছে।’

একই সুরে অভিযোগ জানালেন অল বেঙ্গল ইমাম ও মুয়াজ্জিন সংগঠনের রাজ্য সম্পাদক নিজামুদ্দিন বিশ্বাস। তাঁর দাবি, ‘রাজ্য জুড়ে এক লক্ষ একর সম্পত্তি রয়েছে ওয়াকফের। শুধু মুর্শিদাবাদেই রয়েছে প্রায় চার হাজার একর সম্পত্তি। ওই সব সম্পত্তি রাজ্যে যখন যে ক্ষমতায় এসেছে, তারাই ভোগ দখল করেছে। মোট ওয়াকফ সম্পত্তির ৭০ ভাগই বেদখল হয়ে রয়েছে।’

ওয়াকফ বোর্ডের বর্তমান চিত্র তুলে ধরে নিজামুদ্দিন বিশ্বাস জানান, এই মুহূর্তে বোর্ডের শতাধিক শূন্য পদে কোনও কর্মী নিয়োগ হয়নি। বেদখল হয়ে যাওয়া সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করতে হলে পুলিশ ও প্রশাসনের উপর নির্ভর করতে হয় বোর্ডকে। ওয়াকফ বোর্ডের নিজস্ব কোনও প্রশাসনিক ক্ষমতা নেই। তিনি বলেন, ‘স্থানীয় থানার উপরে নির্ভরশীল হলেই রাজনীতি জড়িয়ে পড়ে এবং ওই সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে।’ ওয়াকফ সম্পত্তি দেখাশোনা করার জন্য একজন ‘মুতায়াল্লি’ নিয়োগ করা হলেও, অভিযোগ উঠেছে রাজনৈতিক চাপে সেই মুতায়াল্লি তাঁর অধীনস্থ ওয়াকফ সম্পত্তি বিক্রি করতে অথবা লিজ় দিতে বাধ্য হন।

মুর্শিদাবাদের কান্দি মহকুমার গোকর্ণ গ্রামের আবু তাহের ব্রিটিশ আমলে তাঁর প্রায় ১২০০ একর জমি ওয়াকফ করে দিয়েছিলেন। অভিযোগ, সেই সম্পত্তির একাংশ, সালার এলাকায় এক তৃণমূল নেতা দখল করে রেখেছেন। একইভাবে লালবাগেও নবাবি আমলের বহু বিঘা ওয়াকফ সম্পত্তি শাসক দলের নেতানেত্রীদের অনুগামীরা দখল করে রেখেছেন। মাস চারেক আগে ওই সম্পত্তির দখলদারি নিয়ে লালবাগ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বোমা ও গুলিও চলেছিল বলে অভিযোগ। মুখতার আলি জানান, কলকাতার শিয়ালদহে বুআলি ওয়াকফ এস্টেটের হস্টেল ও দু’বিঘা জমিও বেদখল হয়ে গিয়েছে। রডন স্ট্রিটে ওয়াকফ সম্পত্তি দখল করে শপিং মল নির্মাণ আদালতের নির্দেশে আটকে রয়েছে। মুখতারের প্রশ্ন, ‘ওয়াকফকে সামনে রেখে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ ধান্ধাবাজি করছেন। এতে সাধারণ মুসলিমের কী হবে?’

সর্বভারতীয় ইমাম-মুয়াজ্জিন সংগঠনের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাকের অভিযোগ, ‘বাম আমলে ওয়াকফ বোর্ড হাতে গোনা কয়েকজন কুক্ষিগত করে রেখেছিলেন। তাঁরা চাননি, ওয়াকফ সম্পত্তি চিহ্নিত হোক। তৃণমূলের আমলে সেই চিহ্নিতকরণের কাজ চলছে, তবে তা খুবই ধীর গতিতে। নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে তিনি দ্রুত ওই সম্পত্তি চিহ্নিত করার এবং দখলদারিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাবেন।’ রাজ্জাকের স্পষ্ট কথা, ‘শাসক দলে থাকা লোকজনই বেশি করে ওয়াকফ সম্পত্তি দখল করে রাখে। সে সব উদ্ধার করে স্কুল, কলেজ, হস্টেল নির্মাণ করা হোক।’

অন্যদিকে, প্রাক্তন সাংসদ অধীর চৌধুরীর সরাসরি অভিযোগ, ‘তৃণমূলের নেতারাই সবচেয়ে বেশি ওয়াকফ সম্পত্তি দখল করে রেখেছেন।’ যদিও ওয়াকফ বোর্ডের অন্যতম সদস্য, জঙ্গিপুরের তৃণমূল সাংসদ খলিলুর রহমান অধীরের বক্তব্য অস্বীকার করে বলেন, ‘২০১১ সালের আগে যদি কেউ মুতায়াল্লি হয়ে থাকেন এবং তিনি ওই সম্পত্তি ভোগদখলের জন্য কাউকে দিয়ে থাকেন, সেটা অন্য কথা। তবে শাসকদলের লোকজন ওই সম্পত্তি দখলে রেখেছে, তা ঠিক কথা নয়।’ খলিলুরের দাবি, ওয়াকফ আইন সংশোধনের ফলে সাধারণ মুসলিমদের মনে হয়েছে, কেন্দ্রীয় সরকার যেমন রাষ্ট্রের সম্পত্তি বিক্রি করে দিচ্ছে, আগামী দিনে ওয়াকফ সম্পত্তিও বিক্রি করে দেবে। তাই এই বিক্ষোভ-আন্দোলন।