“চাকরি হারিয়েছেন একমাত্র শিক্ষক!”-বিদ্যালয়ের ৪০০ পড়ুয়ার পড়াশোনা এখন উঠেছে শিকেয়?

চারশোরও বেশি পড়ুয়া, অথচ একটি স্কুলে পূর্ণ সময়ের শিক্ষকের সংখ্যা ছিল মাত্র একজন। কাকতালীয়ভাবে ২০১৬ সালে স্কুল সার্ভিস কমিশনের নিয়োগ তালিকাতেই তাঁর নাম উঠেছিল। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়ে যে ২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিল হয়েছে, সেই তালিকায় তিনিও রয়েছেন। ফলে ঘোর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে উত্তর দিনাজপুরের গোয়ালপোখর জুনিয়র হাইস্কুলের ভবিষ্যৎ। বর্তমানে সেখানে পূর্ণ সময়ের কোনও শিক্ষক নেই। স্কুলের যাবতীয় দায়িত্ব এখন এসে পড়েছে একজন অতিথি শিক্ষক ও একজন অশিক্ষক কর্মীর কাঁধে।

উত্তর দিনাজপুরের এক প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থিত এই গোয়ালপোখর জুনিয়র হাইস্কুলে পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করানো হয়। এত বিপুল সংখ্যক পড়ুয়াকে সামলানোর কঠিন কাজটি একাই করতেন অরুণ সিংহ। তিনিই ছিলেন স্কুলের একমাত্র স্থায়ী শিক্ষক এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। শুধু ক্লাস নেওয়াই নয়, মিড-ডে মিলের গুণমান পর্যবেক্ষণ থেকে শুরু করে স্কুলের যাবতীয় প্রশাসনিক কাজকর্ম—সরকারি প্রকল্পের রূপায়ণ থেকে নির্দেশ পালন—সবকিছুই অরুণবাবুর হাত ধরেই সম্পন্ন হতো। আদালতের রায়ে তাঁর চাকরি বাতিল হওয়ায় স্কুলটি কার্যত অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে। গত মঙ্গলবার থেকে তিনি স্কুলে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন।

প্রত্যন্ত এই এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল একটি স্কুলের। একসময় এখানকার ছাত্রছাত্রীদের প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে পাঞ্জিপাড়ার এলাহি বক্স হাইস্কুলে যেতে হতো। স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘ আন্দোলনের পর ২০১১ সালে স্থাপিত হয় এই গোয়ালপোখর জুনিয়র হাইস্কুল। এর ফলে স্থানীয়দের সুবিধা হলেও শিক্ষকের অভাব বরাবরই ছিল। তবে হাতের কাছে স্কুল পাওয়ায় পঠনপাঠন কোনোমতে চলছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এখানকার ছেলেমেয়েরা যেন আবারও সেই আগের যুগেই ফিরে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকদের মধ্যে গভীর উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। তবরেজ আলম নামে এক অভিভাবক বলেন, “গ্রামের মধ্যেই স্কুল। হেঁটে আসা-যাওয়া করা যায়। স্কুল বন্ধ হলে আবার সেই ছয় কিলোমিটার দূরে পাঞ্জিপাড়ায় যেতে হবে। এটা অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়। অনেকে হয়তো পড়াশোনা ছেড়ে দেবে।”

শুধু পঠনপাঠনই নয়, অরুণবাবুর অনুপস্থিতি স্কুলের পরীক্ষাকেও প্রভাবিত করবে। কারণ, স্কুলের সিলেবাস শেষ হওয়া এখনও অনেক দূরে! বর্তমানে স্কুলের অতিথি শিক্ষকের উপর এসে পড়েছে বিশাল দায়িত্ব। একজন মাত্র অশিক্ষক কর্মীকে নিয়ে তাঁকে গোটা স্কুল চালাতে হচ্ছে। আগে থেকেই যথেষ্ট চাপ থাকলেও, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের অভাব সেই চাপকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অতিথি শিক্ষক বলেন, “আমাদের পক্ষে এই চাপ সামলানো সম্ভব নয়। মিড-ডে মিল থেকে ক্লাসের পঠনপাঠন—সব ক্ষেত্রেই ব্যাঘাত ঘটছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।”

গোয়ালপোখরের স্কুল পরিদর্শক ইন্দ্রজিৎ দাস গভীর সংকট তৈরি হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন, তবে এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি। এই পরিস্থিতিতে গোয়ালপোখর জুনিয়র হাইস্কুলের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।