“স্তন চেপে ধরাও ধর্ষণের চেষ্টা নয়!”-পকসো রায়ে বিতর্ক উস্কে শীর্ষ কোর্টের হস্তক্ষেপ দাবি মন্ত্রীর

এলাহাবাদ হাইকোর্টের একটি সাম্প্রতিক রায়ে বলা হয়েছে, একটি ১১ বছরের নাবালিকার স্তন খামচে ধরে, পাজামার দড়ি ছিঁড়ে তাকে জোর করে কালভার্টের ধারে টেনে নিয়ে যাওয়া ‘ধর্ষণের চেষ্টা’ নয়। এই রায়কে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষ থেকে আইনজীবী, পুলিশ কর্মকর্তা থেকে সমাজতত্ত্ববিদ—সবাই এই ব্যাখ্যার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কেন্দ্রীয় নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রী অন্নপূর্ণা দেবীও শুক্রবার সংসদের বাইরে এই রায়ের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, “আমি এই রায়ের সঙ্গে একমত নই। শীর্ষ আদালতের কাছে আমার অনুরোধ, তারা যেন এই বিষয়টি খতিয়ে দেখে। এমন বক্তব্য সভ্য সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”
কী ঘটেছিল?
ঘটনাটি উত্তরপ্রদেশের কাসগঞ্জের। ২০২১ সালে দুই অভিযুক্ত, পবন ও আকাশ, এক ১১ বছরের নাবালিকার স্তন চেপে ধরে, তার পাজামার দড়ি ছিঁড়ে এবং তাকে কালভার্টের নীচে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করে। মেয়েটি তার মায়ের সঙ্গে হাঁটছিল, যখন অভিযুক্তরা তাকে বাইকে চাপানোর প্রস্তাব দেয়। পথচারীদের হস্তক্ষেপে তারা পালিয়ে যায়। প্রথমে ট্রায়াল কোর্ট এটিকে ধর্ষণের চেষ্টা (আইপিসি ধারা ৩৭৬) ও পকসো আইনের অধীনে অভিযোগ গঠন করে। কিন্তু অভিযুক্তরা এলাহাবাদ হাইকোর্টে আবেদন করলে বিচারপতি রাম মনোহর নারায়ণ মিশ্র এই অভিযোগ পরিবর্তন করে শ্লীলতাহানি (ধারা ৩৫৪-বি) ও পকসো আইনের অধীনে গুরুতর যৌন নিগ্রহের অভিযোগে সীমাবদ্ধ করেন।
বিচারপতির যুক্তি কী?
বিচারপতি মিশ্রের রায়ে বলা হয়েছে, “অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ও মামলার তথ্য ধর্ষণের চেষ্টার পর্যায়ে পড়ে না। ধর্ষণের চেষ্টা প্রমাণ করতে হলে ‘প্রস্তুতির স্তর’ (প্রিপারেশন) পেরিয়ে ‘আসল প্রয়াসের স্তরে’ (অ্যাটেম্পট) পৌঁছতে হবে। এখানে অভিযুক্তরা ধর্ষণের উদ্দেশ্যে চেষ্টা করেছিল, তার কোনও প্রমাণ নেই। শুধু প্রস্তুতি দেখা গেছে।” তিনি আরও বলেন, “এটি শ্লীলতাহানি বা মহিলার বস্ত্র খোলার উদ্দেশ্যে আক্রমণের ঘটনা, কিন্তু ধর্ষণের চেষ্টা নয়।”
তিনি ‘প্রক্সিমিটি টেস্ট’ প্রয়োগ করে বলেন, ধর্ষণের চেষ্টা হিসেবে গণ্য হতে হলে অভিযুক্তদের কাজ অপরাধের চূড়ান্ত পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছতে হবে। ১৯৬১ সালের সুপ্রিম কোর্টের অভয়ানন্দ মিশ্র বনাম বিহার সরকার মামলার রায়ের উল্লেখ করে তিনি জানান, “প্রস্তুতি ও চেষ্টার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এখানে অভিযুক্তরা প্রস্তুতি নিয়েছিল, কিন্তু চেষ্টার স্তরে পৌঁছয়নি।”
আইনি ব্যাখ্যা ও সমালোচনা
বর্তমানে অবলুপ্ত আইপিসি ১৮৬০-এ ‘ধর্ষণের চেষ্টা’র জন্য আলাদা ধারা ছিল না। ধর্ষণ (ধারা ৩৭৬) ও অপরাধের চেষ্টার শাস্তি (ধারা ৫১১) একত্রে বিবেচনা করে রায় দেওয়া হতো। নতুন ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (বিএনএস) ২০২৩-এ এটি যথাক্রমে ধারা ৬৪ ও ৬২। আইনজীবীরা বলছেন, এই ধারাগুলির ব্যাখ্যায় ‘ইন্টেনশন’ (উদ্দেশ্য), ‘প্রিপারেশন’ (প্রস্তুতি) এবং ‘প্রক্সিমিটি’ (কতটা কাছাকাছি) গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রক্সিমিটির সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা না থাকায় বিভিন্ন আদালত বিভিন্নভাবে এটি ব্যাখ্যা করে।
একজন পাবলিক প্রসিকিউটর তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “স্তন চেপে ধরা, পাজামার দড়ি ছেঁড়া কীভাবে শুধু প্রস্তুতি হবে? মেয়েটির পিছু নেওয়া বা একা পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করাই প্রস্তুতি। এটি স্পষ্ট চেষ্টা। তা হলে কি নাবালিকাকে ধর্ষিত হতে হবে প্রমাণের জন্য?” এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “এই ব্যাখ্যার সঙ্গে আমি একমত নই। এটি ধর্ষণের উদ্দেশ্যকে স্পষ্ট করে।”
প্রতিবাদের ঢেউ
‘রেপ ফ্রি ইন্ডিয়া’ গ্রুপ এই রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের পরিকল্পনা শুরু করেছে। সামাজিক মাধ্যমে এই রায়ের সমালোচনা ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, এই ধরনের রায় কি যৌন নিগ্রহের শিকারদের ন্যায় পাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে? অন্নপূর্ণা দেবী বলেন, “এটি সমাজে ভুল বার্তা দেবে। আমরা এটি নিয়ে আরও আলোচনা করব।”
আগামীর পথ
এই রায় নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার দাবি উঠেছে। আইনি মহল মনে করছে, এটি যৌন নিগ্রহের মামলায় ‘ধর্ষণের চেষ্টা’র সংজ্ঞা ও প্রক্সিমিটির ব্যাখ্যায় নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। বর্তমানে সবার নজর শীর্ষ আদালতের দিকে।