“মামলার নিষ্পত্তি হতে প্রায় তিন বছর..?”- পকসো মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি নয় কেন, বাধা কোথায়?

২০১২ সালে পকসো আইন প্রণয়নের পর, বারাসতের একটি ঘটনায় তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীর যৌন নির্যাতনের মামলায় পুলিশ মাত্র সাত দিনে চার্জশিট দাখিল করে এবং আদালত এক মাসের মধ্যে রায় ঘোষণা করে। এটি সম্ভবত রাজ্যের দ্রুততম পকসো মামলার নিষ্পত্তি।
কিন্তু সার্বিক চিত্রটি ভিন্ন। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলায় পকসো মামলার নিষ্পত্তি হতে গড়ে প্রায় তিন বছর লাগে। সম্প্রতি কুলতলি, ফরাক্কা বা গুড়াপের নাবালিকা ধর্ষণ-খুন মামলাগুলিতে ৫২ থেকে ৬৪ দিনের মধ্যে রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এই দৃষ্টান্তগুলি থেকে প্রশ্ন উঠছে, কেন সব পকসো মামলার বিচার এত দ্রুত হয় না?
এই বিষয়ে পুলিশ ও আইনজ্ঞদের মধ্যে ভিন্ন মত রয়েছে। পুলিশের একাংশের মতে, তাদের কাজ দ্রুত তদন্ত করে চার্জশিট দাখিল করা। বিচারের গতি বিচার ব্যবস্থার অধীনে, তাই তাদের কিছু করার নেই। অন্য অংশের মতে, শুধু চার্জশিট নয়, চার্জ গঠন, সাক্ষীদের হাজির করা—এই সবকিছুই তদন্তকারী সংস্থাকে নিয়মিত তদারকি করতে হয়। আইনজ্ঞদের দাবি, অনেক সময় পুলিশ সঠিকভাবে তদন্ত না করেই চার্জশিট জমা দেয়, যার ফলে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হয়।
এক পুলিশকর্তা জানান, কিছু মামলার দ্রুত রায়ে মানুষের মনে ‘সেন্স অফ জাস্টিস’ তৈরি হয়, কিন্তু এগুলো ব্যতিক্রম। মিডিয়া বা জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণকারী মামলাগুলিতে নিয়মিত তদারকি করা হয়, যাতে দ্রুত বিচার হয়। তবে দৈনন্দিন কাজের চাপ, পরিকাঠামোগত ও আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং কর্মী সংকটের কারণে সব মামলায় সমান মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না।
অন্য এক পুলিশকর্তা বিচার ব্যবস্থার ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, প্রতি তিন মাস অন্তর বিচারকদের ‘কেস ডিসপোজ়াল’ হার খতিয়ে দেখা হয়। এই হার বজায় রাখতে অনেক সময় ‘দুর্বল’ মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা হয়, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলি পিছিয়ে যায়। ফলে অনেক সাক্ষী হতাশ হয়ে সাক্ষ্য দিতে আসেন না।
সরকারি কৌঁসুলিদের মতে, নিখুঁত চার্জশিট দেওয়া হলেও বিভিন্ন কারণে শুনানির দিন পিছিয়ে যায়। তবে কিছু বিচারক মামলাগুলির প্রতি যথেষ্ট সংবেদনশীল, যার ফলে কিছু জেলায় দ্রুত বিচার সম্ভব হয়েছে।
একটি জেলার এসপি-র মতে, মামলার গুরুত্ব বিচার করে অগ্রাধিকার দেওয়া, বিশেষ সরকারি আইনজীবী নিয়োগ ও সাক্ষীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং বিচার ব্যবস্থার সাথে সমন্বয়—এগুলোই মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি করতে পারে।
অবসরপ্রাপ্ত এক বিচারপতির মতে, এই বিষয়ে পুলিশ ও বিচার বিভাগের মধ্যে দোষারোপ করা উচিত নয়। উভয় পক্ষের কিছু সমস্যা আছে, যা দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে দূর করতে হবে।