পিল–কন্ডোম নয়, গর্ভনিরোধে ‘তাবিজ’ সরকারি হাসপাতালে, দিচ্ছেন ডাক্তাররাই

পিল বা কন্ডোমের পরিবর্তে এবার ‘তাবিজ’ লাগিয়েই নাকি আটকানো যাবে গর্ভধারণ! শুনে অবাক লাগলেও, এই ‘তাবিজ’ কোনো ওঝা বা গুনিনের দেওয়া নয়, বরং সরকারি হাসপাতালের ডাক্তাররাই মহিলাদের বাহুতে প্রতিস্থাপন করছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রকের দাবি, এই ‘কনট্রাসেপটিভ ইমপ্লান্ট’ নামক ছোট যন্ত্রটি গর্ভনিরোধক হিসেবে পিল বা কন্ডোমের থেকেও বেশি কার্যকরী।

চার সেন্টিমিটার লম্বা এবং মাত্র দুই মিলিমিটার ব্যাসের এই যন্ত্রটি দেখতে অনেকটা তাবিজের মতোই। এটি মহিলাদের বাহুর ত্বকের নীচে প্রতিস্থাপন করতে মাত্র দশেক মিনিট সময় লাগে। একবার প্রতিস্থাপন করা হলে তিন বছর পর্যন্ত গর্ভধারণ নিয়ে কোনো চিন্তা থাকে না। সঙ্গীকেও কন্ডোম ব্যবহার করতে হয় না। প্রয়োজন হলে, বাহু থেকে ইমপ্লান্ট বের করে নিলে মহিলা পুনরায় গর্ভবতী হতে পারবেন। তবে, এই ইমপ্লান্ট ব্যবহারের আগে চিকিৎসকরা মেডিক্যাল টেস্টের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেবেন।

এই রাজ্যে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ এবং ডায়মন্ড হারবার মেডিক্যাল কলেজে পরীক্ষামূলকভাবে ইমপ্লান্টের ট্রায়াল শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য দপ্তর জানিয়েছে, শীঘ্রই রাজ্যের অন্যান্য মেডিক্যাল কলেজেও এই ট্রায়াল শুরু হবে। জাতীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মিশনের অধীনে পশ্চিমবঙ্গ সহ দেশের ১০টি রাজ্যে সরকারি হাসপাতালে এই ট্রায়াল চলছে। হাতের বাহুতে ছোট যন্ত্রটি প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে বলে স্বাস্থ্যকর্মী ও ডাক্তারদের একাংশ মজা করে একে ‘তাবিজ’ বলছেন। তবে এর সাথে কোনো বুজরুকি নেই, বরং এটি সম্পূর্ণ বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি এবং বিদেশে ইতিমধ্যেই জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

কীভাবে কাজ করে এই যন্ত্র?

কনট্রাসেপটিভ ইমপ্লান্টটি বাহুতে প্রতিস্থাপনের পর নির্দিষ্ট সময়ে প্রোজেস্টেরন হরমোন নিঃসরণ করে, যা রক্তের মাধ্যমে শরীরে ছড়িয়ে পরে। রক্তে প্রোজেস্টেরনের মাত্রা বেশি থাকলে ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু নিঃসরণ হয় না, ফলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা হ্রাস পায়। এছাড়াও, প্রোজেস্টেরনের প্রভাবে জরায়ুর মুখের মিউকাস ঘন হয়ে ওঠে এবং জরায়ুর আস্তরণ পাতলা হয়ে যায়, যা শুক্রাণুর নিষেক প্রক্রিয়াকে বাধা দেয়। অর্থাৎ, প্রোজেস্টেরনের ‘ত্রিফলা’ পদ্ধতি গর্ভধারণ প্রতিরোধ করে।

স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ সঞ্জীব মুখোপাধ্যায় জানান, ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে এই ইমপ্লান্ট কার্যকরী প্রমাণিত হলে মহিলাদের প্রতিদিন গর্ভনিরোধক পিল খাওয়ার ঝামেলা থেকে মুক্তি মিলবে এবং পিলের ডোজ মিস হওয়ার ঝুঁকিও কমবে।

সূত্রের খবর, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক একটি বিদেশি কোম্পানির সাথে চুক্তি করে এই যন্ত্রটি ব্যবহারে জোর দিয়েছে। ড্রাগস কন্ট্রোল জেনারেল অব ইন্ডিয়া (ডিসিজিআই) এর অনুমতি পাওয়ার পরেই কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন রাজ্যে ট্রায়ালের জন্য পাঠানো হচ্ছে। প্রতিস্থাপনের আগে দম্পতির আধার কার্ডের তথ্য যাচাই করা হয় এবং তাদের সম্মতি নেওয়া হয়। দিল্লি, উত্তর প্রদেশ, বিহার, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু, রাজস্থান, গুজরাট, ওড়িশা এবং অসমের মতো অধিক জনসংখ্যা বিশিষ্ট রাজ্যগুলিতে এই ইমপ্লান্টের ট্রায়াল বেশি করে হচ্ছে। চিকিৎসক মহলের একাংশের দাবি, এর কার্যকারিতা প্রায় ৯৯ শতাংশ।