মোবাইল স্ক্রিন ব্যবহার বাড়ছে শিশুদের, দেখা দিচ্ছে ‘ভার্চুয়াল অটিজম’, জানুন কি রোগ?

র্তমান ডিজিটাল যুগে স্মার্টফোন, ট্যাবলেট কিংবা কম্পিউটারের স্ক্রিন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। শুধু বিনোদন বা শিক্ষা নয়, যোগাযোগেরও অন্যতম মাধ্যম এখন এই গ্যাজেটগুলি। তবে প্রযুক্তির এই সহজলভ্যতার সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগও বহুগুণ বেড়ে গেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে ‘ভার্চুয়াল অটিজম’ (Virtual Autism) শব্দটি অত্যন্ত চর্চায় রয়েছে। অনেক অভিভাবকই প্রশ্ন তুলেছেন, এটি কি আদৌ চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্বীকৃত কোনো রোগ এবং এটি কি আসলেই অটিজমের কোনো রূপ?

‘ভার্চুয়াল অটিজম’ কি চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্বীকৃত?

বাস্তবতা হলো, চিকিৎসা বিজ্ঞানের দিক থেকে ‘ভার্চুয়াল অটিজম’ কোনো স্বীকৃত রোগ বা টার্ম নয়। এমনকি বিশ্বখ্যাত ডিএসএম-৫-টিআর (DSM-5-TR) বা আইসিডি-১১ (ICD-11)-এর মতো আন্তর্জাতিক রোগ নির্ণয় নির্দেশিকাতেও এই শব্দটির কোনো অস্তিত্ব নেই। মূলত যে সমস্ত শিশুরা দীর্ঘ সময় ধরে স্ক্রিনের সামনে বা ডিজিটাল মাধ্যমের সংস্পর্শে থাকার ফলে অটিজম-সদৃশ কিছু আচরণ প্রদর্শন করে, তাঁদের বোঝাতেই বিশেষজ্ঞরা এই পরিভাষাটি ব্যবহার করে থাকেন।

এই শিশুদের মধ্যে প্রায়শই যে সমস্ত লক্ষণগুলি দেখা যায়, তার মধ্যে রয়েছে:

  • বাক বা ভাষা বিকাশে মারাত্মক দেরি হওয়া।

  • চোখে চোখ রেখে কথা না বলা (Lack of Eye Contact)।

  • কারোর ডাকে সাড়া দেওয়ার প্রবণতা কমে যাওয়া।

  • সামাজিক মেলামেশা বা মিশুকে স্বভাবের অভাব।

  • একই আচরণ বারবার পুনরাবৃত্তি করা এবং বাস্তব মানুষের চেয়ে স্ক্রিনের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি।

লক্ষণগুলি অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারের (ASD) সঙ্গে মিলে যাওয়ায় অনেক সময় অভিভাবকরা দারুণভাবে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। তবে বর্তমান বৈজ্ঞানিক গবেষণা স্পষ্টভাবে জানাচ্ছে যে, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার অটিজমের কারণ নয়। অটিজম একটি অত্যন্ত জটিল স্নায়বিক বিকাশজনিত অবস্থা, যা মূলত জেনেটিক বা জৈবিক কারণে হয়ে থাকে। শুধু বেশি সময় স্ক্রিন দেখার কারণে কোনো শিশুর অটিজম হতে পারে—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম কেন ক্ষতিকর?

যদিও স্ক্রিন সরাসরি অটিজম তৈরি করে না, তবুও এর অতিরিক্ত ব্যবহার শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ছোট শিশুরা মূলত সরাসরি মানুষের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া বা মেলামেশার মাধ্যমেই ভাষা, আবেগ, সামাজিক আচরণ এবং যোগাযোগের দক্ষতা শেখে। কিন্তু স্ক্রিনের সামনে দীর্ঘ সময় কাটালে তারা সেই প্রাকৃতিক শেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।

এর ফলে শিশুদের মধ্যে মনোযোগের ঘাটতি, আবেগ বোঝার দুর্বলতা এবং পরিবেশগত প্রভাবজনিত বিকাশগত বিলম্ব দেখা দিতে পারে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন ‘ভার্চুয়াল অটিজম’ শব্দটি বিভ্রান্তিকর, কারণ এটি এমন এক ধারণার জন্ম দেয় যে শিশুটি বুঝি স্থায়ী অটিজমে আক্রান্ত, অথচ বাস্তবে এই সমস্যাগুলি সঠিক পদক্ষেপ ও যত্নে অনেকটাই পরিবর্তনযোগ্য।

অভিভাবকদের জন্য করণীয় ও পরামর্শ

প্রযুক্তি নিজে কোনো সমস্যা নয়, আসল সমস্যা হলো এর অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। অভিভাবকের উপস্থিতিতে নির্দিষ্ট ও সীমিত সময়ের জন্য শিক্ষামূলক কনটেন্ট দেখা এবং শিশুকে একা দীর্ঘ সময় মোবাইল বা ট্যাবলেটের সামনে বসিয়ে রাখার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ রয়েছে।

শিশুর সুস্থ ও স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করতে হলে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার কোনো বিকল্প নেই। খেলাধুলা, গল্প বলা, বই পড়া, ছবি আঁকা এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলার অভ্যাস শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে অপরিহার্য। চিকিৎসকদের মতে—

  • ২ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের স্ক্রিন সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা উচিত।

  • বড় শিশুদের ক্ষেত্রেও স্ক্রিন ব্যবহারের সময় কঠোরভাবে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বেঁধে দেওয়া জরুরি।

সর্বোপরি, প্রযুক্তি যেন শিশুর বিকাশে সহায়ক হয়, তার বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়। শিশুরা যেন কোনোভাবেই বাস্তব মানবিক সংযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে পড়ে, সেদিকে প্রতিটি অভিভাবক ও শিক্ষককে সজাগ থাকতে হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *