“মঙ্গল মিশন’ ব্যর্থ হলেও…?”-ক্ষতি নেই ইলোন মাস্কের, ফাঁস হলো বিস্ফোরক তথ্য

মঙ্গল অভিযানের মতো টেসলার (Tesla) নির্ধারিত সবচেয়ে কঠিন লক্ষ্যগুলো পূরণ করতে না পারলেও মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্ক (Elon Musk) টেসলার সঙ্গে করা চুক্তি অনুসারে হাজার কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ পেতে পারেন।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে মার্কিন ইলেকট্রিক ভেহিকেল (EV) নির্মাতা টেসলার পরিচালনা পর্ষদ মাস্ককে কর্পোরেট ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বেতন প্যাকেজটি দেওয়ার প্রস্তাব করেছিল। সেই সময় বোর্ড বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করেছিল যে, ১০ বছরের মধ্যে টেসলার শেয়ারের মাধ্যমে ৮৭ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের এই বিশাল বেতন প্যাকেজটি পেতে হলে মাস্ককে ‘মঙ্গল অভিযানের মতো বড় সাফল্য’ অর্জন করতে হবে।
পরিচালনা পর্ষদ তাদের প্রস্তাবে বলেছিল, এই পারিশ্রমিক পাওয়ার জন্য মাস্ককে টেসলা ও আমাদের সমাজকে পুরোপুরি বদলে দিতে হবে, বিশেষ করে রোবটিক্স, অটোনমাস গাড়ি প্রযুক্তি, শেয়ারমূল্য ও মুনাফার ক্ষেত্রে তাঁকে বড় পরিবর্তন আনতে হবে। অন্যথায়, তিনি যদি এই ‘বিস্ময়করভাবে উচ্চাকাঙ্ক্ষী’ লক্ষ্যগুলো পূরণ করতে না পারেন, তবে তাঁর পুরস্কারের অংক হবে ‘শূন্য’।
রয়টার্সের বিশ্লেষণে ভিন্ন চিত্র:
তবে রয়টার্সের বিশ্লেষণ বলছে, মাস্কের কাজের লক্ষ্য, নির্বাহী বেতন, কোম্পানির মূল্যায়ন এবং রোবটিক্স ও অটোনমাস গাড়ি নিয়ে এক ডজনেরও বেশি বিশেষজ্ঞের মতামতের ভিত্তিতে দেখা গিয়েছে—মাস্ক সেই নির্ধারিত লক্ষ্যগুলোর বেশিরভাগ পূরণ না করলেও কয়েকশ কোটি ডলার আয় করতে পারেন। রয়টার্সের পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, টেসলার পরিচালনা পর্ষদের তুলনামূলক সহজ কিছু লক্ষ্য পূরণ করেই মাস্ক পাঁচ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি পেতে পারেন। এক্ষেত্রে এসব লক্ষ্য পূরণের জন্য টেসলার পণ্য বা ব্যবসায় কোনো বিপ্লব ঘটানোর শর্ত জরুরি নয়।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইকুইলার’-এর হয়ে রয়টার্সের জন্য করা এক বিশ্লেষণ অনুসারে, পরিচালনা পর্ষদের সবচেয়ে সহজ দুটি লক্ষ্য অর্জন করেই, বিশেষ করে টেসলার শেয়ারমূল্যে সামান্য বৃদ্ধি ঘটিয়েই মাস্ক প্রায় দুই হাজার ৬০০ কোটি ডলার আয় করতে পারেন। মাস্কের এই আয়ের অংকটি এতটাই বিশাল যে, তা বিশ্বের পরবর্তী আটজন সর্বোচ্চ বেতনধারী সিইওর আজীবন আয়ের যোগফলের চেয়েও বেশি। এই সিইওদের মধ্যে রয়েছেন মেটার মার্ক জাকারবার্গ, ওরাকলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি এলিসন, অ্যাপলের প্রধান টিম কুক ও এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং।
গাড়ি বিক্রির লক্ষ্য পূরণেও ‘ছাড়’:
চারজন অটোমোবাইল বিশেষজ্ঞের মতে, মাস্কের গাড়ি বিক্রির বিভিন্ন লক্ষ্য সহজেই পূরণ করা সম্ভব। তাঁদের বিশ্লেষণ বলছে, আগামী দশকে মাস্ক যদি প্রতি বছর গড়ে ১২ লাখ গাড়ি বিক্রি করতে পারেন (যা ২০২৪ সালে টেসলার বিক্রি হওয়া গাড়ির সংখ্যার চেয়ে প্রতি বছর প্রায় পাঁচ লাখ কম), তবে তিনি প্রায় আটশ ২০ কোটি ডলার মূল্যের টেসলা শেয়ার পাবেন। এমনকি টেসলার বাজারমূল্য যদি এখনকার ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০৩৫ সালে মাত্র ২ ট্রিলিয়ন ডলার হয় (যা দীর্ঘমেয়াদি বাজারের গড় বৃদ্ধির চেয়েও কম), তবুও তিনি এই অর্থ পাবেন। এদিকে, কমে আসা গাড়ি বিক্রির সংখ্যা ফের বাড়াতে সম্প্রতি নিজেদের ‘মডেল ওয়াই এসইউভি’ ও ‘মডেল ৩ সেডান’-এর সাশ্রয়ী দামের নতুন সংস্করণ উন্মোচন করেছে টেসলা।
অস্পষ্ট পণ্য উন্নয়নের লক্ষ্য:
রয়টার্সের জন্য মাস্কের এসব লক্ষ্য পর্যালোচনা করা ছয়জন রোবটিক্স ও অটোনমাস গাড়ি শিল্পের বিশেষজ্ঞ বলছেন, মাস্কের বেতন প্যাকেজে তিনটি পণ্য উন্নয়ন সম্পর্কিত লক্ষ্য এতটাই অস্পষ্ট ভাষায় লেখা যে, সেগুলো কোম্পানির মুনাফা বৃদ্ধি না করেই মাস্ককে বড় ধরনের অর্থ উপার্জনের সুযোগ দিতে পারে।
এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে টেসলা ও মাস্কের সাড়া মেলেনি। তবে এক বিবৃতিতে টেসলার পরিচালনা পর্ষদের একজন মুখপাত্র বলেছেন, “যতদিন না কোম্পানির মূল্য প্রায় দ্বিগুণ হচ্ছে ও কার্যকরী এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকে টেসলা পৌঁছাচ্ছে ততদিন পর্যন্ত প্রস্তাবিত এ বেতন প্যাকেজটি আমাদের সিইওর জন্য আসলে তেমন কোনো মূল্য রাখে না।”
বেতন প্রস্তাবে বোর্ড বলেছিল, মাস্ককে টেসলার একজন নির্বাহী হিসেবে কমপক্ষে সাড়ে সাত বছর থাকতে হবে তবেই তিনি শেয়ারভিত্তিক পুরস্কার পাবেন। যদিও তিনি পুরস্কার পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভোটাধিকার পাবেন, কিন্তু এসব শেয়ারের পুরো মালিকানা পেতে তাঁকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। গত মাসে মাস্ক তাঁর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে বলেছিলেন, এই বেতন প্যাকেজ “বেতনের জন্য নয়, বরং লাখ লাখ রোবট তৈরির পর এগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য টেসলার ওপর আমার যথেষ্ট প্রভাব থাকার বিষয়ে।”