“ছবিতে ক্লিক করলেই সর্বনাশ!”-WhatsApp-এ হ্যাকারদের ভয়ংকর এক নতুন ফাঁদ

সোশ্যাল মিডিয়ার প্ল্যাটফর্ম হোয়াটসঅ্যাপ এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যমই নয়, এটি সাইবার অপরাধীদের জন্য প্রতারণার এক নতুন এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করে হ্যাকাররা হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারীদের ফাঁদে ফেলে তাদের আর্থিক ও ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে। সম্প্রতি হোয়াটসঅ্যাপে তেমনই এক ভয়ংকর নতুন ফাঁদের খবর সামনে এসেছে, যা পুরোনো সব পরিচিত পদ্ধতিকে হার মানাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞেরা জানাচ্ছেন, হোয়াটসঅ্যাপে হ্যাকারদের এই নতুন কৌশলটি অত্যন্ত বিপজ্জনক কারণ এতে কোনো লিঙ্কে ক্লিক করা, ওটিপি শেয়ার করা কিংবা অ্যাপ ডাউনলোডের মতো পরিচিত ফাঁদের কৌশল নেই। বরং, আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ দেখতে একটি ছবির মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে আসল বিপদ। ছবিতে ক্লিক করা মাত্রই আপনার অজান্তেই স্মার্টফোনে ঢুকে পড়বে ক্ষতিকর সফটওয়্যার বা ম্যালওয়্যার।
কীভাবে ঘটছে এই নতুন ধরনের প্রতারণা?
এই নতুন পদ্ধতির প্রতারণা কীভাবে কাজ করে, তা বোঝার জন্য সম্প্রতি ভারতের একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার দিকে নজর দেওয়া যাক। এক ভুক্তভোগীর কাছে একটি অজানা নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে একটি ছবি আসে। ছবির সঙ্গে ছিল একটি সংক্ষিপ্ত বার্তা— “ছবিতে থাকা ব্যক্তিকে আপনি কি চিনতে পারেন?”
প্রথমদিকে তিনি বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি এবং ছবিটি খোলেননি। কিন্তু সেই অজানা নম্বর থেকে বারবার ফোন আসার কারণে তার সন্দেহ দূর হয়। ফোনদাতার পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে এবং তাকে পরিচিত ভেবে, শেষ পর্যন্ত তিনি কৌতূহলবশত ছবিতে ক্লিক করেন।
কিন্তু এখানেই ঘটে আসল সর্বনাশ। ছবিতে ক্লিক করা মাত্রই অজান্তেই তার স্মার্টফোনে ইনস্টল হয়ে যায় একটি ম্যালওয়্যার। এই ক্ষতিকর সফটওয়্যারটি মুহূর্তেই ডিভাইসের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় হ্যাকারদের হাতে। এর ফলস্বরূপ, সেই ব্যক্তির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে এক ধাক্কায় ২ লাখ টাকা উধাও হয়ে যায়।
সাইবার বিশেষজ্ঞরা এই পদ্ধতিকে আরও বিপজ্জনক বলছেন কারণ এটি ব্যবহারকারীকে সরাসরি কোনো সংবেদনশীল তথ্য, যেমন ওটিপি, পাসওয়ার্ড কিংবা ব্যাংক ডিটেইলস চাইতে হয় না। এমনকি কোনো সন্দেহজনক লিঙ্কে ক্লিক করার অনুরোধও থাকে না। শুধু একটি নিরীহ দেখতে ছবিতে ক্লিক করলেই হ্যাকারদের উদ্দেশ্য সফল হয়।
এই ধরনের সাইবার অপরাধের মূল হোতাদের শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে, কারণ হ্যাকাররা নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতে ভিপিএন (VPN) এবং নানান অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।
এই ম্যালওয়্যার কী কী ক্ষতি করতে পারে?
স্মার্টফোনে একবার প্রবেশ করলে এই ম্যালওয়্যার আপনার অজান্তেই নিম্নলিখিত ভয়াবহ ক্ষতিগুলি ঘটাতে পারে:
- আপনার স্মার্টফোনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে যেতে পারে হ্যাকারদের হাতে।
- আপনার ব্যাংক সংক্রান্ত স্পর্শকাতর তথ্য, যেমন অ্যাকাউন্ট নম্বর, পিন, ইত্যাদি চুরি হয়ে যেতে পারে।
- আপনার ডিভাইসের ক্যামেরা, মাইক্রোফোন ও লোকেশন ব্যবহারের মাধ্যমে আপনার উপর গোপনে নজরদারি চালানো হতে পারে।
- আপনার নাম্বার ব্যবহার করে আপনার পরিচিতদের কাছে বা অন্যদের কাছে স্ক্যাম কল ও ম্যাসেজ পাঠিয়ে নতুন ফাঁদ তৈরি করতে পারে।
কীভাবে বাঁচবেন এই ভয়ংকর ফাঁদ থেকে?
সাইবার নিরাপত্তা সংস্থাগুলো এবং কেরল পুলিশের মতো বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই নাগরিকদের এই নতুন ফাঁদ সম্পর্কে সতর্ক করেছে। ডিজিটাল জগতে নিরাপদ থাকতে কিছু সহজ কিন্তু অত্যন্ত জরুরি পদক্ষেপ মানা আবশ্যক:
- অজানা ফাইল খুলবেন না: অজানা নম্বর থেকে আসা কোনো ফাইল, বিশেষ করে ছবি বা ভিডিও, ডাউনলোড বা ওপেন করা থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকুন।
- অটো ডাউনলোড বন্ধ রাখুন: হোয়াটসঅ্যাপে প্রাইভেসি সেটিংস-এ গিয়ে ‘মিডিয়া অটো ডাউনলোড’ অপশনটি বন্ধ করে রাখুন। এটি করলে আপনার অনুমতি ছাড়া কোনো ছবি বা ভিডিও ডাউনলোড হবে না।
- অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহার করুন: আপনার স্মার্টফোনে একটি বিশ্বস্ত অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার ইন্সটল করে রাখুন এবং সেটিকে নিয়মিত আপডেট করুন।
- সফটওয়্যার আপডেট রাখুন: আপনার স্মার্টফোনের অপারেটিং সিস্টেম ও অ্যাপগুলো সর্বদা সর্বশেষ ভার্সনে আপডেট রাখুন। আপডেটেড সফটওয়্যার সুরক্ষা ত্রুটিগুলি (security vulnerabilities) ঠিক করে, যা হ্যাকাররা ব্যবহার করতে পারে।
- অজানা কল ও মেসেজে সতর্ক হোন: অজানা নম্বর থেকে কোনো ফোন কল বা মেসেজ পেলে সতর্ক থাকুন এবং ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করা থেকে বিরত থাকুন।
আজকের দিনে ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিজেকেই হতে হবে সবচেয়ে বেশি সচেতন। প্রযুক্তির এই যুগে এক ক্লিকের ভুলেও আপনার কষ্টের জমানো টাকা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে যেকোনো সময়। তাই অজানা উৎস থেকে আসা যেকোনো ছবি বা ফাইল খোলার আগে দুবার ভাবুন।