পৃথিবীর ম্যান্টলে লুকানো জল যেভাবে অগ্নুৎপাতে প্রভাব ফেলে, জেনেনিন কী বলছে বিজ্ঞানীরা?

পৃথিবীর অভ্যন্তরভাগ যে কতটা উত্তপ্ত এবং গলিত, তা আমরা কমবেশি সকলেই জানি। আর সেই উত্তপ্ত তরলের উপরেই ভাসমান রয়েছে টেকটোনিক প্লেটগুলো, অনেকটা দুধের সরের মতো। এই প্লেটগুলো যখন একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খায়, তখনই ভূপৃষ্ঠ কেঁপে ওঠে, হয় ভূমিকম্প—এটাই সাধারণ জ্ঞান। তবে প্রশ্ন ওঠে, টেকটোনিক প্লেটের একেবারে মাঝের অংশে, যেখানে প্লেট সীমানা নেই, সেখানে ভূমিকম্পের কারণ কী?
বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেটের প্রান্ত থেকে বহু দূরে অবস্থিত আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত নিয়ে ধন্দে ছিলেন। এই ধরনের আগ্নেয়গিরিগুলো ‘ইন্ট্রাপ্লেট আগ্নেয়গিরি’ নামে পরিচিত। বিজ্ঞানভিত্তিক ওয়েবসাইট নোরিজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই আগ্নেয়গিরিগুলোর অগ্ন্যুৎপাত স্বাভাবিক নিয়ম মেনে চলে না, কারণ বেশিরভাগ আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপই টেকটোনিক প্লেটের সীমানার ওপর নির্ভরশীল।
অবশেষে, ‘রেওয়াজের বাইরে’ ঘটা এই ভূকম্পনের এক রোমাঞ্চকর ব্যাখ্যা উঠে এসেছে নতুন এক গবেষণায়। এই গবেষণা অনুযায়ী, পৃথিবীর গভীরে সঞ্চিত জলই সম্ভবত এর মূল কারণ।
গবেষকরা জানাচ্ছেন, ভূপৃষ্ঠের প্রায় ৪১০ থেকে ৬৭০ কিলোমিটার গভীরে ‘ম্যান্টল ট্রানজিশন জোন’ বা এমটিজেড নামে একটি স্তর রয়েছে। যদিও আমরা এই স্তরটি দেখতে পাই না, তবে পৃথিবীর এই অঞ্চলে বিপুল পরিমাণে জল থাকতে পারে, যার পরিমাণ একাধিক মহাসাগরের মোট জলের সমান হতে পারে। এই স্তরের জল তরল সমুদ্রের মতো প্রবাহিত না হয়ে ‘রিংউডাইট’ ও ‘ওয়াডসলাইট’-এর মতো খনিজ পদার্থের ভেতরে আবদ্ধ থাকে। এই খনিজ উপাদানগুলো আবার উচ্চ চাপের মধ্যে গঠিত হয়।
কিন্তু প্রশ্ন হল, এই জল সেখানে পৌঁছাল কীভাবে? বিভিন্ন টেকটোনিক প্লেটের পৃথিবীর আবরণের নিচে তলিয়ে যাওয়াকে ‘সাবডাকশন’ বলা হয়। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জলসমৃদ্ধ শিলা ভূগর্ভের গভীরে প্রবেশ করে। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে এইভাবেই পৃথিবীর গভীরে থাকা এমটিজেড স্তরের কিছু অংশ ভিজে রয়েছে।
তবে বিজ্ঞানীরা এখনও নিশ্চিত নন যে এই জল ঠিক কোথায় রয়েছে বা কতটা সমানভাবে পৃথিবীর গভীরে ছড়িয়ে আছে। কারণ সাবডাকটিং প্লেটগুলোর আকার, আকৃতি, গতি এবং অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে। এর ফলে পৃথিবীর ম্যান্টল জুড়ে জল অসমভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এই গবেষণার জন্য গবেষক হেলেন ওয়াং এবং তার দল গত ৪০ কোটি বছর ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন প্লেট কীভাবে স্থানান্তরিত হয়েছে, তার একটি মডেল ব্যবহার করেছেন। তারা এমন বিভিন্ন অঞ্চলের মানচিত্র তৈরি করেছেন, যেখানে জল বিভিন্ন পথে ম্যান্টল ট্রানজিশন জোনে পৌঁছেছে। এরপর সেই অঞ্চলগুলোকে গত আড়াই কোটি বছর ধরে আন্তঃপ্লেট আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের স্থানগুলোর সঙ্গে তুলনা করেছেন বিজ্ঞানীরা।
গবেষণায় পৃথিবীর ম্যান্টলে লুকানো জলের সঙ্গে আগ্নেয়গিরি অগ্ন্যুৎপাতের একটি শক্তিশালী যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া গেছে। প্রায় ৪২ শতাংশ থেকে ৬৮ শতাংশ আন্তঃপ্লেট আগ্নেয়গিরি ম্যান্টল অঞ্চলের উপরেই ঘটেছে, যেগুলোতে জলের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। যেসব অঞ্চলে জল তিন থেকে ১০ কোটি বছর ধরে ম্যান্টলের মধ্যে ছিল, সেখানে এই সংযোগ আরও জোরালো দেখা গেছে। এর থেকে ইঙ্গিত মেলে যে, ম্যান্টলে দীর্ঘ সময় ধরে জল সঞ্চিত থাকার বিষয়টি শেষ পর্যন্ত আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারণ ঘটাতে পারে।
এই গবেষণা পূর্ব এশিয়া, পশ্চিম উত্তর আমেরিকা এবং পূর্ব অস্ট্রেলিয়ার মতো অঞ্চলে আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করতে পারে, কারণ এই অঞ্চলের আগ্নেয়গিরিগুলো পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেট সীমানা থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। অন্যদিকে, ভারত মহাসাগর, দক্ষিণ পূর্ব আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আটলান্টিকের মতো বিভিন্ন অঞ্চল, যা পৃথিবীর এমটিজেড স্তরের শুষ্ক অংশের উপরে অবস্থিত, সেখানে আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ তুলনামূলকভাবে কম দেখা গেছে। এই গবেষণা টেকটোনিক প্লেটের মধ্যবর্তী অংশে ভূমিকম্পের কারণ অনুসন্ধানেও নতুন দিশা দেখাতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।