‘রেললাইনে রক্তের স্রোতে ছিন্নভিন্ন লাশ, কখনও ভুলব না’-ঘটনার বিবরণ দিলেন আহত যাত্রীরা

“তখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, হঠাৎ বিকট শব্দের সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন আমার উপড়ে এসে হুড়মুড়িয়ে পড়ে; কোনোভাবে সেখান থেকে বের হয়ে দেখি অনেকে আটকে আছে বেশকিছু কোচের নিচে, যাদের গগণবিদারী আর্তনাদ আর চিৎকার কেবল চারদিকে,” বলছিলেন ভারতে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া করমণ্ডল এক্সপ্রেসের যাত্রী স্বপন কুমার।

স্বপনের মতো অনেকে ভয়াবহ সেই মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছেন শুক্রবার রাতে; সারি সারি লাশ আর অন্ধকারে ভেসে আসা আর্তনাদে ভড়কে গেছেন উদ্ধার কাজে হাত বাড়ানো ব্যক্তিরাও।

ভারতের উড়িষ্যায় বালেশ্বরের ওই ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ২৮৮ জনে দাঁড়িয়েছে এবং ৮৫০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন বলে দেশটির এক সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

মর্মান্তিক সেই দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া করমণ্ডল এক্সপ্রেস ট্রেনের আরেক যাত্রী টুইটে লিখেছেন, “সেখান থেকে অক্ষত ফিরতে পেরে আমি চির কৃতজ্ঞ। সম্ভবত এটি ভারতের সবচেয়ে বড় ট্রেন দুর্ঘটনা।”

এনডিটিভি জানিয়েছে, অনুভব দাস নামের সেই যাত্রী লিখেন, “বেঙ্গালুরু-হাওড়া সুপারফাস্ট এক্সপ্রেসের তিনটি সাধারণ কোচ সম্পূর্ণভাবে লাইনচ্যুত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া করমণ্ডল এক্সপ্রেসের জেনারেল, স্লিপার, এসি থ্রি টায়ার এবং এসি টু টায়ারসহ প্রায় ১৩টি কোচ ‘সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত’ হয়েছে।”

তিনি নিজেই ২০০-২৫০ এরও বেশি জনকে মৃত দেখেছেন বলে দাবি করেছেন অনুভব দাস।

“ট্রেনে থাকা পরিবারগুলো ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। রেললাইনে রক্তের স্রোত আর অঙ্গহীন লাশ। এটি এমন এক দৃশ্য, যা আমি কখনও ভুলব না। ভগবান পরিবারগুলোকে সাহায্য করুন। তাদের প্রতি আমার সমবেদনা।”

দুর্ঘটনার যে বর্ণনা পাওয়া গেছে তা অনুযায়ী, করমণ্ডল এক্সপ্রেস পেছন থেকে ধাক্কা দেয় একটি মালগাড়িকে। করমণ্ডল এক্সপ্রেসের ইঞ্জিনটি সেই মালগাড়ির উপরে উঠে যায়। ২৩টি বগির মধ্যে ১৫টি লাইন থেকে ছিটকে পড়ে পাশের ডাউন লাইনে। সেই লাইন দিয়ে তখন আসছিল বেঙ্গালুরু-হাওড়া সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস। করমণ্ডল এক্সপ্রেসের লাইনচ্যুত বগিগুলো গিয়ে পড়ে সেই লাইনের উপর। বেঙ্গালুরু-হাওড়া ট্রেনটির দুটি কামরাও তখন লাইনচ্যুত হয়।

করমণ্ডল এক্সপ্রেসের যাত্রী কৃষ্ণপদ বলেন, “মুহূর্তের মধ্যে কী হয়ে গেল কিছুই বুঝতে পারলাম না। আমার গায়ে তখন এসে পড়েছে আরও কয়েক জন। দমবন্ধ হয়ে আসছিল। বুঝলাম, আমাদের কামরাটি উল্টে গিয়েছে পুরো। দুর্ঘটনায় পড়েছি।”

কলকাতা হাওড়া থেকে দ্রুতগামী এই ট্রেনে উঠেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের এই বাঙালি, যাচ্ছিলেন চেন্নাই।

দুর্ঘটনার বর্ণনায় কৃষ্ণপদ বলেন, “হঠাৎই বিকট একটা ঝাঁকুনি। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের কামরা এক দিকে হেলে পড়তে থাকে। এস ৪ কামরা এতটাই কাত হয়ে যায় যে খোলা দরজা গলে বাইরে পড়ে যান দু-তিন জন। ওদের ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। বুঝতে পারছি, আমিও হেলে পড়ছি খোলা দরজার দিকে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই লোহার দরজাটা দড়াম করে বন্ধ হয়ে যায়। আমি গিয়ে পড়ি সেই দরজার উপর। এক মুহূর্ত আগে পড়লে আমিও ট্রেন থেকে বাইরে পড়ে যেতাম। কী বাঁচা যে বেঁচেছি, তা শুধু আমিই জানি।

“সেই মুহূর্তে চার দিক থেকে কেবল চিৎকার আর আর্তনাদের শব্দ। হঠাৎ খেয়াল হল, কাকা কোথায়? খুঁজতে যে যাব, তারও উপায় নেই। কাঁধে, হাতে, পায়ে, কপালের কোণে চোট পেয়েছি। আর যে ভাবে পড়ে আছি, একা ওঠার সাধ্য নেই।”

‘সবকিছু কাঁপছিল’

দুর্ঘটনার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমগুলোতে ভয়ঙ্কর সেই মুহূর্তের চিত্র তুলে ধরেছেন অনেকে, যাদের একজন দিনমজুর সঞ্জয় মুখিয়া।

এনডিটিভি জানিয়েছে, করমণ্ডল এক্সপ্রেস ট্রেনে চেন্নাই যাচ্ছিলেন বিহারের বাসিন্দা সঞ্জয়। কিন্তু ট্রেনের টয়লেটে যাওয়ার পরই হঠাৎ বিশাল ঝাঁকুনি অনুভব করেন।

“সবকিছু কাঁপছিল। বুঝতে পারছিলাম, ট্রেনটি কাত হয়ে উল্টে যাচ্ছে।”

ওই ঘটনায় সঞ্জয় আহত হয়েছেন। তবে ঘটনার পরপরই উদ্ধার পান তিনি।

‘ঘাড়ের ওপর এসে পড়ে ১০-১৫ জন’

এনডিটিভির কাছে সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে আহত এক যাত্রী বলেন, “বগিটি যখন লাইন থেকে পড়ে যায় তখনই জেগে যাই। আমার গায়ের ওপর এসে পড়ে ১০-১৫ জন মানুষ। মাথা ও ঘাড়ে ব্যাথায় কাবু হয়ে গেছিলাম।”

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ট্রেন থেকে যখন কোনো রকমে বের হয়ে আসি তখন চারপাশে মানুষের ছিন্ন বিচ্ছিন্ন অঙ্গ পড়ে থাকতে দেখি। কারও হাত এখানে, কারও পা ওদিকে। অনেকের মুখমণ্ডল একেবারে থেতলে গেছে।

তিনটি কোচে ২৬ জনের একটি বড় দলের সঙ্গে কেরালার দিকে যাচ্ছিলেন মোহাম্মদ আকিব; তাদের দলের বেশিরভাগই ছাত্র।

আকিব বলেন, “আমরা এস-৪, এস-৩, এস-২ কোচের ভেতরে ছিলাম। হঠাৎ একটা বিকট শব্দ শুনতে পাই। এরপর কোচগুলো উল্টে যায়। তবে আমরা সবাই নিরাপদ ছিলাম।”

বিধ্বস্ত কোচের জানালা দিয়ে দলটিকে বের করে আনা হয়। আকিবল বলেন, “আমরা ভাগ্যবান যে বেঁচে আছি। আমরা এখন কোথাও যেতে চাই না, বিহারে ফিরে যেতে চাই।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *