পশ্চিমি জোটের বিরুদ্ধে ‘দীর্ঘ যুদ্ধের জন্য’ রাশিয়াকে প্রস্তুত করছেন পুতিন?

ডিসেম্বরের শেষ দিকে এক সন্ধ্যা, মস্কোবাসীরা যখন বছর শেষ হওয়ার উদযাপনে অংশ নিতে শহরের উজ্জ্বল আলো আলোকিত রাস্তা ধরে হাঁটছিলেন, তখন এক সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তার বাসায় এক দল বন্ধু নৈশভোজের জন্য একত্রিত হয়েছিলেন।

এতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন রাশিয়ার সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অভিজাত ব্যক্তিরা। নতুন বছরের কামনায় তারা শান্তি এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রত্যাশা করেছিলেন।

রাত যত গভীর হচ্ছিল, হাতে গ্লাস নিয়ে একজন বলেন, আমি ধারণা করছি সবাই প্রত্যাশা করছে আমি কিছু বলি। তিনি আর কেউ নন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ।

তিনি বলে চলেন, পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে। এই পরিস্থিতির অবসান হতে আরও অনেক সময় লাগবে।

তার এই মন্তব্যে নৈশভোজে উপস্থিত ব্যক্তিদের মুখ কিছুটা কালো হয়ে যায়। এদের অনেকেই একান্তে ইউক্রেনে যুদ্ধের বিরোধী।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে এক অতিথি বলেন, তার বক্তব্য শোনা ছিল অস্বস্তিদায়ক। এটি স্পষ্ট যে, তিনি সতর্ক করছিলেন যুদ্ধ দীর্ঘায়ত হবে বলে এবং আমাদের সেই দীর্ঘ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।

রাশিয়ার পরিকল্পনা অনুসারে, ইউক্রেনে বিশেষ সামরিক অভিযান সমাপ্ত হতে কয়েক সপ্তাহ লাগার কথা। কিন্তু যুদ্ধটি এক বছর পেরিয়ে দুই বছরে গড়িয়েছে। এখনও সমাধানের কোনও ইঙ্গিত স্পষ্ট হচ্ছে না। এই পুতিনের সরকারের এই যুদ্ধ রুশ সমাজকে পশ্চিমাদের সঙ্গে সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে এবং আরও কয়েক বছর ধরে বহুমুখী সংঘাতের জন্ম দিচ্ছে।

‘রাশিয়ার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই’

সম্প্রতি একটি মহাকাশ কারখানায় বক্তব্য দেওয়ার সময় পুতিন আরও একবার বলেছেন, এই যুদ্ধ রাশিয়ার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই।

তার মতে, আমাদের জন্য এটি কোনও ভূ-রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়, এটি রাশিয়ার রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকার লড়াই, আমাদের দেশ ও সন্তানদের জন্য জন্য ভবিষ্যৎ উন্নয়নের শর্ত সৃষ্টির কর্মকাণ্ড।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ম্যাক্সিম ট্রুডোলিউবভ বলছেন, পুতিনের পরবর্তী ভাষণগুলোতেও এই নমুনা ছিল। এসব ভাষণের মধ্য দিয়ে পুতিন পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছেন।

ম্যাক্সিম ট্রুডোলিউবভ বলেন, পুতিন কার্যত যুদ্ধের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছেন। তিনি একটি ভিশন হাজির করছেন যাতে ভবিষ্যতের একটি জয় কেমন হবে তা তুলে ধরছেন। এই যুদ্ধের কোনও সুনির্দিষ্ট শুরু ও দৃশ্যমান সমাপ্তি নেই।

গত মাসে ‘স্টেট অব দ্য নেশন’ ভাষণে পুতিন পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগের পুনরাবৃত্তি করেছিলেন। জোর দিয়েছিলেন, মস্কো জাতীয় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য লড়াই করছে এবং শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে।

ট্রুডোলিউবভ বলছেন, জনগণের কোমল আবরণে পুতিনের বার্তা ছিল ইউক্রেনের যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হবে না এবং রুশদের এর মধ্যে বেঁচে থাকতে হবে।

ফেব্রুয়ারি মাসে পুতিনের যুদ্ধমূলক ভাষণ শুনে পশ্চিমা কর্মকর্তারা হতাশা ব্যক্ত করেছেন। তাদের মতে, এটি দেখিয়ে দিয়েছে রুশ নেতা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষেই অবস্থান নিচ্ছেন এবং পিছু হটার মতো কোনও সুযোগ রাখছেন না।

মস্কোতে কর্মরত একজন পশ্চিমা কূটনীতিক পুতিনের ভাষণের বার্তাকে রুশ জনগণকে ‘অনন্তকালের যুদ্ধের’ জন্য প্রস্তুত করার চেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

ওই কূটনীতিক বলেন, এটা স্পষ্ট নয় পুতিন সংঘাতে পরাজয় মেনে নেবেন কিনা। কারণ তিনি ‘কীভাবে হারতে হয় তা বোঝেন’ বলে মনে হয় না।

তিনি ব্যক্তি আরও বলেন, গত বছরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও ব্যর্থতার পরও পুতিন সংঘাত থেকে পিছু হটার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করছেন বলে মনে হচ্ছে না। রুশ প্রেসিডেন্ট কেজিবির একজন সাবেক এজেন্ট ছিলেন। কেজিবি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, লক্ষ্য পুনরায় মূল্যায়নের বদলে সর্বদা অর্জনের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার জন্য।

‘পুতিনের ভাষণে অনুপস্থিত ইউক্রেন যুদ্ধ’

পশ্চিমা গোয়েন্দাদের মতে, ব্যক্তিগতভাবে ইউক্রেনে অপারেশনাল এবং কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন রুশ নেতা। সম্প্রতি তিনি প্রকাশ্য মন্তব্যে ইউক্রেনের রণাঙ্গনের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা বন্ধ করে দিয়েছেন।

একটি রুশ সংবাদমাধ্যমের পরিচালিত জনমত জরিপ অনুসারে, সর্বশেষ ১৫ জানুয়ারি পুতিন ভাষণে ইউক্রেনে সংঘাতের কথা উল্লেখ করেছিলেন। ওই সময় তিনি দাবি করেছিলেন, ইউক্রেনে রুশ সেনাবাহিনীর গতিশীলতা ‘ইতিবাচক’ ছিল।

হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন রুশ রাজনীতির অধ্যাপক ভ্লাদিমির গেলম্যান যুক্তি তুলে ধরে বলছেন, রণাঙ্গনের গতিপথ পরিবর্তন করতে অক্ষমতাকে স্বীকারে ক্রেমলিনের অস্বস্তির প্রকাশ হলো পুতিনের ভাষণ থেকে ইউক্রেনের কথা বাদ পড়া।

গেলম্যান বলেন, যখন আপনার সেনাবাহিনী কোনও অগ্রগতি অর্জন করছে না তখন যুদ্ধের প্রচেষ্টা সম্পর্কে কথা না বলা সহজ। কিন্তু পিছিয়ে যাওয়া পুতিনের জন্য কোনও বিকল্প নয়, তার কাছে এর অর্থ হবে পরাজয় স্বীকার করা।

যুদ্ধের শুরুতে পশ্চিমা গোয়েন্দাদের হাতে আসা রুশ সমর পরিকল্পনা অনুসারে, রুশ নেতৃত্ব প্রাথমিকভাবে আশা করেছিল মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তারা ইউক্রেনে জয় পাবে।

নতুন তিন লাখ সেনা নিয়োগের পর পশ্চিমা সামরিক বিশ্লেষক ও ইউক্রেনের কর্মকর্তারা বারবার সতর্ক করেছিলেন, শীতের শেষের দিকে রাশিয়া নতুন একটি আক্রমণ শুরু করতে পারে।

‘বড় আক্রমণের সক্ষমতা নেই রুশ সেনাবাহিনীর’

কিন্তু ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে রুশ বাহিনী। গত ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া আক্রমণে ইউক্রেনে ১৬০ মাইল বিস্তৃত রণাঙ্গনে খুব কম অগ্রগতি অর্জন করেছে। পশ্চিমা কর্মকর্তাদের অনুমান, রাশিয়ার অন্তত ২ লাখ সেনা আহত বা নিহত হয়েছে।

মার্কিন সামরিক বিশেষজ্ঞ রব লি বলেছেন, ‘রাশিয়ার একটি বড় আক্রমণ চালানোর মতো আক্রমণাত্মক ক্ষমতা নেই।

লির মতে, ইউক্রেনের রুশ সেনাবাহিনীর দশ শতাংশেরও কম আক্রমণাত্মক অভিযানে সক্ষম। বেশিরভাগ সেনা সীমিত প্রশিক্ষণের পরে রণাঙ্গনে যোগ দিয়েছে। তাদের বাহিনী ধীরে ধীরে ছোট ছোট সাফল্য পেতে পারে। তবে ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষামূলক রেখার মধ্য দিয়ে বড় আক্রমণ চালানোর ক্ষমতা নেই, যা যুদ্ধের গতিপথ বদলে দেবে।

দীর্ঘ মেয়াদে রুশ সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করার জন্য রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু সশস্ত্র বাহিনীর সেনা সংখ্যা ১১ লাখ ৫০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১৫ লাখ করার প্রস্তাব দিয়েছেন।

রব লি বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি রাশিয়ার সামরিক বাহিনী দীর্ঘ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। পুতিন আশা করছেন, রুশ সম্পদের কারণে পিছিয়ে পড়বে ইউক্রেন। কারণ পশ্চিমারা কিয়েভ সহযোগিতা করতে এক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়বে।’

ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরও দেশে যুদ্ধবিরোধী যেকোনও সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া কঠোরভাবে মোকাবিলা করেছে। রাশিয়ার সুশীল সমাজের যুদ্ধবিরোধী অংশকে দমন করছে এবং এই প্রক্রিয়ায় দেশের ভাবমূর্তি পুনর্নির্মাণ করেছে।

কার্নেগি এনডাউমেন্টের একজন সিনিয়র ফেলো আন্দ্রেই কোলেসনিকভ বলেছেন, ‘দেশের অনেকেই এখন পুরোপুরি স্বীকার করছে এই যুদ্ধ খুব দ্রুত শেষ হচ্ছে না। তারা বিশ্বাস করে এই বাস্তবতার অধীনে তাদের বাঁচতে শিখতে হবে।

কোলেসনিকভ আরও বলেছেন, অনেক পর্যবেক্ষকের প্রত্যাশার চেয়ে রুশ জনগণের নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ইচ্ছা ও ক্ষমতা অনেক বেশি শক্তিশালী।

‘বাস্তবতা মেনে নিচ্ছে রুশ জনগণ’

সেপ্টেম্বরে ৩ লাখ সেনা সমাবেশের আদেশ দিয়ে পুতিনের ঘোষণার পর সমাজবিজ্ঞানীরা রুশ সমাজে ভয় ও উদ্বেগের বৃদ্ধি লক্ষ্য করেছিলেন। পুরুষরা ছিলেন যুদ্ধে যোগ দিতে উদ্বিগ্ন, মা ও স্ত্রীরা তাদের স্বামী, পিতা ও ছেলেদের নিয়ে ছিলেন উদ্বিগ্ন।

কোলেসনিকভের মতে, কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যে ভয় কমে গেছে।

ক্রেমলিনের মিডিয়া ম্যানেজারদের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলছে, মানুষের প্রাথমিক দ্বিধা থাকলেও সরকারি প্রচার সফল হয়েছে। প্রথম দিকের যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভে প্রথম সপ্তাহে সারা দেশে ১৫ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

সূত্রটি আরও বলেছে, সরকার রুশ পতাকার নিচে জনগণকে সমবেত করতে পেরেছে। যে কৌশলে সংঘাত পরিকল্পনা করা হয়েছিল তা মানুষদের এটি মেনে নিতে সহযোগিতা করেছে।

এই যুদ্ধ যে রাশিয়ার পরিচিতি ও টিকে থাকার জন্য জরুরি, এই বার্তা ছড়িয়ে দিতে রাষ্ট্রের পূর্ণ ক্ষমতা কাজে লাগানো হয়েছে। জাতীয় টেলিভিশনগুলো হালকা বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের বদলে আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক টক শো প্রচারে গুরুত্ব দেয়। স্কুলগুলোতে মৌলিক সামরিক প্রশিক্ষণ এবং দেশাত্মবোধ পাঠ অধ্যয়ন শুরু হয়, যাতে করে ইউক্রেন যুদ্ধের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়। যুদ্ধবিরোধীদের বিশ্বাসঘাতক মুক্ত হতে পুতিনের আহ্বানের পর অনেকেই তাতে সাড়া দেন।

মস্কোর বাইরের একটি অভিজাত স্কুলের সাবেক ইতিহাস শিক্ষক আলেক্সেই বলেন, দেশ একেবারে পাগল হয়ে গেছে। আমাকে সহকর্মী ও বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করতে হয়েছে। আমরা এখন ভিন্ন বাস্তবতায় বাস করছি।

ইউক্রেনে যুদ্ধবিরোধী হাজারো রুশ নাগরিক নীরব বা দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। এই শূন্যতায় যুদ্ধের সমর্থক একটি গোষ্ঠী রাশিয়াকে নতুন দিকে নিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধে রাশিয়ার ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে ধারনা থাকার পরও তারা এই সংঘাতকে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক যুদ্ধ হিসেবে হাজির করার চেষ্টা করছে।

‘ইউরোপে বাড়ছে নাৎসিবাদ’

মার্চের মাঝামাঝিতে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় থাকা ইন্টারন্যাশনাল মুভমেন্ট অব রুশোফাইলস’ নামের একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। এতে যোগ দেন ইউরোপীয় উগ্রবাদী কিছু অ্যাক্টিভিস্ট, ষড়যন্ত্র তত্ত্ববিদেরা। ওই অনুষ্ঠানের বার্তা ছিল ভয়াবহ।

ভাষণে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বলেছিলেন, আমরা শুধু নব্য নাৎসি দেখছি না। আমরা সরাসরি নাৎসিবাদ দেখছি। যা আরও বেশি ইউরোপীয় দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।

রক্ষণশীল রুশ ধনকুবের কন্সতান্তিন মালোফিভ বলেছেন, বার্লিনের বিরুদ্ধে জয়ের মাধ্যমে রুশ সেনারা যুদ্ধ অবসানের পর হতে এমন বিদ্বেষ আমরা কখনও দেখিনি। আমরা যুদ্ধ থামিয়েছিলাম, কিন্তু এখন আমরা বিজেতারাই আরও একবার দেখছি আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।

দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *