নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় উত্তপ্ত ত্রিপুরা, আহত ১০০ র বেশি রাজনৈতিক কর্মী

নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার পর থেকে ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য। গত দুই দিনে খুনের ঘটনা না ঘটলেও শাসক (বিজেপি)-বিরোধী উভয় দলের সংঘর্ষে অন্তত শতাধিক কর্মী-সমর্থক আহত হয়েছেন। তাদের অনেকেই রাজ্যের বিভিন্ন জেলা ও মহাকুমা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার আগে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচন কর্মকর্তা কিরণ গিত্যে প্রতিটি ভোট বুথে শান্তি সভা করার আহ্বান জানান। সে অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিনিধিদের নিয়ে সেসব সভাও সম্পন্ন করে। সেসময় সবাই রাজ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রতিজ্ঞা করেন। কিন্তু ফল ঘোষণা হতেই প্রতিজ্ঞা ভুলে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মী-সমর্থকরা।
রাজ্যের ৬০টি বিধানসভা কেন্দ্রের প্রায় প্রতিটিতেই এখন টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। পুনরায় ক্ষমতাসীন হলেও, বিরোধী দলের হামলার শিকার হয়েছেন বিজেপির অনেক কর্মী-সমর্থক।
জানা যায়, বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি কর্মীদের দেখতে গেছেন সদ্য প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ডা. মানিক সাহা। সেময় তিনি তিনি আহতদের চিকিৎসা সংক্রান্ত যাবতীয় খোঁজ-খবর নেন ও সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দেন।
এদিকে, বলতে গেলে এবছরই রাজ্য রাজনীতিতে প্রথমবারের মতো নাম লিখিয়েছে জনজাতি (ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী) ভিত্তিক রাজনৈতিক দল তিপ্রা মথা। সেই সঙ্গে এ নির্বাচনে এক লাফে জনজাতি অধ্যুষিত এলাকার সংরক্ষিত ২০ আসনের ১৩টিই দখল করেছে দলটি।
এবার রাজা প্রদ্যুৎ কিশোর মাণিক্য দেববর্মনের নেতৃত্বাধীন তিপ্রা মথা পার্টির প্রার্থীদের কাছে পরাজয় বরণ করতে হয়েছে অন্যান্য দলের অনেক হেভি ওয়েট প্রার্থীকেও। চার আসন কমে এ বছর ৩২টি আসনে জয় পেয়েছে বিজেপি। আর শরিক দল মিলে আগে যেখানে বিজেপির আসন সংখ্যা ছিল ৪৪, সেখানে এবার তা দাঁড়িয়েছে ৩৩টি।
অন্যদিকে, গতবার যেখানে ১৬টি আসনে জয় পেয়েছিল, এবার সেখানে ১১টি আসন দখল করতে পেরেছে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী) (সিপিআইএম)। আবার কংগ্রেস যেখানে গত নির্বাচনে কোনো আসনে জয়লাভ করতে পারেনি, এবার তারা তিনটি আসনে জয় পেয়েছে।
মথা সুপ্রিমো বা মহারাজ প্রদ্যুৎ কিশোর মাণিক্য দেববর্মন দীর্ঘদিন ধরেই গ্রেটার তিপ্রাল্যান্ডের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। সে অনুযায়ী ভোটের আগেও লিখিত প্রতিশ্রুতির শর্তে এক জোটে লড়াইয়ের বার্তা দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শর্ত না মানায় এককভাবেই লড়াইয়ে নামে তিপ্রা মথা পার্টি। এক প্রকার জিদের বশেই শুধু পাহাড়ে নয়, সমতলেও প্রার্থী দেন প্রদ্যুৎ কিশোর।
বিজেপিসহ অন্য দলগুলোর দাবি, প্রথমবারের মতো ১৩ আসনে জয় পেয়ে উৎফুল্ল তিপ্রা মথা পার্টির কর্মী-সমর্থকরা রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে নির্বাচন পরবর্তী সন্ত্রাস কায়েম রেখেছে। বিশেষ করে বাঙালি অংশের জনগোষ্ঠীর ওপর চড়াও হচ্ছেন তারা। এতে পাহাড়ি এলাকাগুলোতে চরম অস্থিরতা শুরু হয়েছে। তাছাড়া, এমন পরিস্থিতিতে দেখা মিলছে না পার্টি প্রধান প্রদ্যুৎ কিশোরের।
এদিকে বাম-কংগ্রেসের মধ্যে মতানৈক্য দেখা না দিলেও, জোটটির নেতা-কর্মীরা বিজেপির হামলার শিকার হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমনকি, অনেকেরই বাড়ি-ঘরে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও খবর পাওয়া যায়।
এদিকে, ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করার অভিযোগও উঠেছে নলছড় বিধানসভা এলাকায়। এ কেন্দ্র থেকে এবারের নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক কিশোর বর্মন। এলাকাজুড়ে অস্থিরতা সৃষ্টি করলেও নেতা-কর্মীদের শান্ত করার কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি কিশোর বর্মনকে। অন্যদিকে, বিজেপির দাবি, অনেক ক্ষেত্রে তাদের কর্মীরাও বিরোধী দলের হামলার শিকার হচ্ছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনে শতকরা হিসাবে বিজেপির ভোটের হার যেখানে ছিল ৫২ শতাংশের কাছাকাছি, সেখানে এ বছর ২০ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ৩২ জন বিজেপি সমর্থক রয়েছেন। এ অবস্থায় বিরোধীদলের সমর্থকরা কোনোভাবেই রাজ্য শাককের স্থানে বিজেপিকে মেনে নিতে পারছেন না। আর এ কারণেই একের পর এক হামলা, পালটা হামলার ঘটনা ঘটছে ত্রিপুরায়।