“১২,০০০ কোটির পাহাড়প্রমাণ ঋণ!”-দেউলিয়া ঘোষিত ভিডিয়োকন কর্তা বেণুগোপাল ধূত

ভারতের একসময়ের অন্যতম প্রভাবশালী শিল্পপতি তথা ভিডিয়োকন গোষ্ঠীর (Videocon Group) প্রাক্তন কর্ণধার এবং ম্যানেজিং ডিরেক্টর বেণুগোপাল নন্দলাল ধূতকে আনুষ্ঠানিকভাবে দেউলিয়া ঘোষণা করল ন্যাশনাল কোম্পানি ল ট্রাইব্যুনাল (NCLT)। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার (SBI) দায়ের করা একটি আবেদনের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার এই নির্দেশ দিয়েছে মুম্বইয়ের এনসিএলটি বেঞ্চ। ভিডিয়োকন ইন্ডাস্ট্রিজের বিপুল পরিমাণ ঋণের ব্যক্তিগত গ্যারান্টর হিসেবে ধূতের কাছে ব্যাঙ্কের ১২,৬৬৮ কোটি টাকারও বেশি বকেয়া রয়েছে। আর সেই বিশাল অঙ্কের ঋণ অনাদায়ের জেরেই এবার তাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও আর্থিক দায়দায়িত্ব বাজেয়াপ্ত করে দেউলিয়া সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া শুরু হতে চলেছে। এই প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে একজন ‘ব্যাঙ্করাপসি ট্রাস্টি’ও নিয়োগ করা হয়েছে।
১২ পাতার রায়ে কী জানাল এনসিএলটি? এনসিএলটির দুই সদস্যের বেঞ্চ— বিচার বিভাগীয় সদস্য বিনয় গোয়েল এবং টেকনিক্যাল সদস্য চরঞ্জিত সিং গুলাটি তাঁদের ১২ পাতার সুনির্দিষ্ট নির্দেশে স্পষ্ট জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত গ্যারান্টর হিসেবে বেণুগোপাল নন্দলাল ধূতকে দেউলিয়া ঘোষণা করা হলো।
একই সঙ্গে ট্রাস্টির উদ্দেশ্যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, ধূতের সমস্ত ঋণদাতার কাছ থেকে দাবি ও পাওনা সংক্রান্ত সঠিক তথ্য চেয়ে জনসমক্ষে বিজ্ঞপ্তি জারি করতে হবে। পরবর্তীতে তাঁর সমস্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিক্রি করে যে অর্থ সংগ্রহ হবে, তা আইনানুগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঋণদাতাদের মধ্যে আনুপাতিক হারে বণ্টন করা হবে।
আইনের কড়া নিয়ম অনুযায়ী, দেউলিয়া প্রক্রিয়া শুরুর তারিখ থেকে মাত্র সাত দিনের মধ্যে ধূতকে নিজের যাবতীয় সম্পদ, আয়, ব্যক্তিগত আর্থিক দায় மற்றும் সামগ্রিক আর্থিক অবস্থার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ নির্ধারিত নথিতে ট্রাস্টির কাছে জমা দিতে হবে। পাশাপাশি, এই প্রক্রিয়া শুরুর ৯০ দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল এবং ঋণদাতাদের কমিটির (CoC) কাছে একটি প্রাথমিক রিপোর্ট জমা দেবেন ট্রাস্টি। এরপর থেকে প্রতি তিন মাস অন্তর মামলার অগ্রগতির রিপোর্টও ট্রাইব্যুনালের সামনে পেশ করতে হবে।
কীভাবে শুরু এই বিপুল ঋণখেলাপের সূত্রপাত? পুরো ঘটনাটির মূলে রয়েছে ভিডিয়োকন ইন্ডাস্ট্রিজ়ের হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণখেলাপ। জানা গিয়েছে, সংস্থাটি স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া এবং তার একাধিক সহযোগী ব্যাঙ্কের কাছ থেকে বিপুল ঋণ নিয়েছিল। সেই সহযোগী ব্যাঙ্কগুলির মধ্যে ছিল স্টেট ব্যাঙ্ক অফ হায়দরাবাদ, স্টেট ব্যাঙ্ক অফ মহীশূর, স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ত্রিবাঙ্কুর, স্টেট ব্যাঙ্ক অফ বিকানের অ্যান্ড জয়পুর এবং স্টেট ব্যাঙ্ক অফ পাতিয়ালা (পরবর্তী সময়ে ২০১৭ সালের এপ্রিলে এই সমস্ত ব্যাঙ্কগুলি এসবিআই-এর সঙ্গেই মিশে যায়)। এছাড়া ভিডিয়োকন টেলিকমিউনিকেশনসও কয়েকটি ঋণের ক্ষেত্রে কো-গ্যারান্টর হিসেবে যুক্ত ছিল।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ঋণ পরিশোধ না হওয়ায় ব্যাঙ্কের পাওনা সুদে-আসলে আকাশছোঁয়া হয়ে দাঁড়ায়। এসবিআই-এর তরফে আদালতে পেশ করা তথ্যে জানানো হয়েছে, ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সুদ ও জরিমানা মিলিয়ে মোট অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ গিয়ে ঠেকেছে ১২,৬৮৮.০৬ কোটি টাকায়!
এই বিশাল বকেয়ার হিসাবের মধ্যে রয়েছে:
-
রুপি টার্ম লোন: ৯,৩২২.১০ কোটি টাকা।
-
ভিডিয়োকন টেলিকমিউনিকেশনস-এর ঋণ: ১,৪৩৭.৭৬ কোটি টাকা।
-
কার্যকরী মূলধনের ঋণ (Working Capital): ১,৯০৮.১৯ কোটি টাকা।
সবথেকে বড় বিষয় হলো, এই সমস্ত ঋণের বিপরীতে ব্যক্তিগত গ্যারান্টি দিয়েছিলেন স্বয়ং বেণুগোপাল ধূত। সংস্থা ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই সেই গ্যারান্টি কার্যকর করে দেয় এসবিআই। যার ফলস্বরূপ, ভিডিয়োকন কোম্পানির সেই বিশাল ঋণ মেটানোর আইনি দায়ভার ব্যক্তিগতভাবে এখন এসে পড়েছে বেণুগোপাল ধূতের কাঁধে।