“পুরোটাই ব্যবসার ফন্দি!” ধনতেরাসে সোনা কেনার হিড়িক নিয়ে যা বললেন নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি

ধনতেরাস মানেই জহুরির দোকানে উপচে পড়া ভিড়, সোনার বা রুপোর কয়েন কেনা কিংবা নতুন বাসনপত্র বা ঝাঁটা ঘরে আনা। দীপাবলির আগে এই বিশেষ তিথিকে আমরা মূলত সম্পদ, সমৃদ্ধি এবং কেনাকাটার উৎসব হিসেবেই চিনে এসেছি। কিন্তু প্রখ্যাত পুরাণবিদ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ির বিস্ফোরক দাবি, ধনতেরাসের সঙ্গে সোনা-রুপো বা টাকার লেনদেনের দূরদূরান্তেও কোনো সম্পর্ক নেই! এটি সম্পূর্ণ আধুনিক যুগের বাণিজ্যিক প্রথা ছাড়া আর কিছুই নয়।

আসল ধনতেরাস কার পুজো? কে ছিলেন ধন্বন্তরি?

হিন্দু পুরাণ ও বেদ অনুসারে, ধন্বন্তরি কোনো অলৌকিক অর্থের দেবতা নন, তিনি হলেন প্রাচীন ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক ঐতিহাসিক ও কিংবদন্তি পুরুষ। তাঁকে বলা হয় অপারেশন বা অস্ত্রোপচারের দেবতা এবং আয়ুর্বেদ চিকিৎসার জনক।

ভাগবত পুরাণ অনুযায়ী, সমুদ্র মন্থনের সময় অমৃতের পাত্র হাতে জলের তলা থেকে উঠে এসেছিলেন ধন্বন্তরি। মানবজাতির রোগ নিরাময় ও সেবা করার জন্য তাঁকে মর্ত্যে পাঠানো হয়েছিল। চরক সংহিতা ও অগ্নিপুরাণ সাক্ষ্য দেয় যে, সুশ্রুত এবং ঔরভের মতো প্রাচীন ঋষিদের আয়ুর্বেদের ঐশ্বরিক জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছিলেন তিনি নিজে। মানুষের শারীরিক সুস্থতা ও স্বাস্থ্য কামনার মাধ্যমেই মূলত ধন্বন্তরির আরাধনা শুরু হয়, যার থেকে আজকের এই উৎসবের নামকরণ হয়েছে।

কী বলছেন পুরাণবিদ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি?

বর্তমান প্রজন্মের এই সোনা কেনার উন্মাদনা ও ধনতেরাসের আধুনিক রূপ নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন প্রখ্যাত পুরাণবিদ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি। তাঁর পরিষ্কার বক্তব্য, “ধনতেরাস ব্যাপারটা আমার কাছে খুব আশ্চর্য লাগে। আমাদের ছোটবেলায় আমরা কোনো ধনতেরাস দেখিনি। এর কোনো শাস্ত্রীয় ভিত্তি আমি দেখিনি। স্বাস্থ্যসেবা এবং আয়ুর্বেদের সঙ্গে যুক্ত একজন বৈদ্য ধন্বন্তরিকে নিয়ে আমরা হঠাৎ কীভাবে টাকা-পয়সা এবং গয়না কেনার বাণিজ্যিক উৎসবে চলে গেলাম?”

তিনি আরও যোগ করেন, “যদি কারও শখ থাকে সোনা কেনার, তিনি কিনতেই পারেন। কিন্তু এই ত্রাস তৈরি করার কোনো প্রয়োজন নেই যে, আজ সোনা না কিনলে জীবনে খুব বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। এটা একটা সম্পূর্ণ আধুনিক ব্যাপার, যা শুধুই ব্যবসার স্বার্থে তৈরি করা হয়েছে।”

সুস্থতা ও সুস্বাস্থ্যের প্রতীক ধনতেরাস

ধনতেরাস বা ধন্বন্তরি জয়ন্তী মূলত স্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু এবং রোগমুক্ত জীবনের প্রার্থনা করার দিন। প্রাচীনকালে এই তিথিতে মানুষ তাঁদের রোগ নিরাময়কারী চিকিৎসক বা বৈদ্যদের সম্মান জানাতেন এবং সুস্বাস্থ্যের প্রার্থনা করতেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধর্মাচরণের মোড়কে এই প্রাচীন স্বাস্থ্য উৎসব কীভাবে নিখাদ কেনাকাটা ও বিপণনের বাজারে পরিণত হয়েছে, তা নিয়েই এখন প্রশ্ন তুলছেন বুদ্ধিজীবীরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *