উত্তর কলকাতার বলরাম ঘোষ স্ট্রিটে ঘোমটা কালীর রহস্যময় মন্দির! যেখানে ভয়ঙ্করী নন, দেবী পূজিতা হন ঘরের মায়াময়ী মেয়ে রূপে

উত্তর কলকাতার চেনা গলি। একপাশে পুরনো আমলের ইতিহাস মাখা ঐতিহ্যবাহী বাড়ি, আর অন্যপাশে দাঁড়িয়ে থাকা আধুনিক ফ্ল্যাটবাড়ি। এই দুই যুগের সাঁকোতেই পরম নিস্তব্ধতার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে এক অবাক করা ইতিহাস। কালীর সেই চেনা ভয়ংকর ভয়ঙ্করী রূপ, পিঠের ওপর ছড়ানো খোলা চুল কিংবা গলার রক্তঝরা মুণ্ডমালা—এখানে এর কোনোটাই নেই! উত্তর কলকাতার বলরাম ঘোষ স্ট্রিটের এই মন্দিরের ভিতর শান্ত, অত্যন্ত স্নিগ্ধ এক দেবী মূর্তি রূপায়িত হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আর সবচেয়ে বড় চমক হলো, তাঁর মাথায় টানা রয়েছে খুব সুন্দর একটি ঘোমটা! ঠিক যেন সাধারণ বাঙালি ঘরের কোনো এক মায়াময়ী লক্ষ্মীমেয়ে। শ্যামবাজারের পাঁচ মাথার মোড় থেকে ভূপেন বোস অ্যাভিনিউ ধরে একটু এগোলেই মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র কলেজ। তার ঠিক উল্টো দিকের রাস্তা ধরে হাঁটলে শ্যামপুকুর থানা। আর তার ঠিক সামনেই ঐতিহাসিক বলরাম ঘোষ স্ট্রিট। এখানেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে রয়েছে এই অলৌকিক ও রহস্যময় ‘ঘোমটা কালী’ মন্দির।
কিন্তু সর্বশক্তিমান দেবীর কেন এমন সাধারণ ঘরের বধূর মতো রূপ? এই ঐতিহাসিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে আজ থেকে প্রায় দেড়শো বছর আগে। সালটা ছিল ১৮৮৮। তৎকালীন উত্তর কলকাতার অত্যন্ত প্রতাপশালী ও নামডাকওয়ালা জমিদার ছিলেন বলরাম ঘোষ। তাঁরই যোগ্য বংশধর তুলসীরাম ঘোষ এক বিশেষ রাতে এক অদ্ভুত এবং অলৌকিক স্বপ্ন প্রত্যক্ষ করেছিলেন। মাঝরাতে তাঁর স্বপ্নে সরাসরি এলেন স্বয়ং বিশ্বজননী দেবী কালী। কিন্তু সেই স্বপ্নে দেখা রূপ কোনো সাধারণ উগ্র রূপ ছিল না। দেবীর মাথায় দেওয়া ছিল পরিপাটি ঘোমটা, আর তাঁর মুখাবয়বে ফুটে উঠেছিল অদ্ভুত এক মায়া, মমতা ও শান্তির অমলিন ছাপ।
ঘুম ভাঙার পর সেই স্বপ্নে দেখা অচেনা কিন্তু অদ্ভুত মায়াবী মুখ কিছুতেই মন থেকে মুছে ফেলতে পারলেন না তুলসীরাম ঘোষ। তিনি একনিষ্ঠভাবে ঠিক করলেন, মায়ের এই শান্ত ও স্নিগ্ধ রূপকেই তিনি মন্দিরে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করবেন। যেমন ভাবা, তেমন কাজ! স্বপ্নে প্রত্যক্ষ করা রূপ হুবহু অনুসরণ করেই অত্যন্ত যত্নসহকারে তৈরি করানো হলো দেবীর মৃন্ময়ী মূর্তি। সেই যে শুরু হয়েছিল ঐতিহ্য, আজও সেই শতাব্দী প্রাচীন নিয়ম ও রীতি মেনেই নিখুঁতভাবে পুজো হয়ে আসছে এই মন্দিরে।
মন্দিরের নিত্যদিনের রীতিনীতিও অত্যন্ত চমৎকার ও বৈচিত্র্যময়। প্রতিদিন নিয়ম করে শাস্ত্রীয় উপাচারে দেবীর পুজো হয়। আর মায়ের নিত্যদিনের ভোজে থাকে নুন ছাড়া তৈরি করা বিশেষ লুচি, পাঁচ রকমের ভাজা, বোঁদে এবং হরেক রকমের মিষ্টান্ন। কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে অর্থাৎ কালীপুজোর বিশেষ রাতে এই মন্দির প্রাঙ্গণে ভক্তদের উপচে পড়া ভিড়ে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। পাশাপাশি, বাসন্তী পঞ্চমীর দিনও এখানে বিরাট এক উৎসব ও মেলার আয়োজন করা হয়। কারণ, ইতিহাস অনুযায়ী ওই বিশেষ শুভ দিনেই এই ঐতিহাসিক মন্দিরটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
উচ্চমার্গের তান্ত্রিক ও তন্ত্রসাধক থেকে শুরু করে সাধারণ গৃহস্থ মানুষ—সবার কাছেই এই ঘোমটা কালী মন্দির এক পরম বিশ্বাস ও গভীর আস্থার পবিত্র তীর্থক্ষেত্র। সাধকরা দেবীকে দক্ষিণাকালীর পরম শান্ত রূপ হিসেবে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পুজো করেন। আবার অনেক অনুরাগী ভক্ত ভালোবেসে মায়ের নাম দিয়েছেন ‘ছোট ভবতারিণী’। উত্তর কলকাতার স্থানীয় মানুষের কাছে তিনি শুধুই এক অদৃশ্য শক্তি বা দেবী নন, তিনি যেন এই অঞ্চলের প্রতিটি ঘরের একান্ত আপনজন। যেকোনো বিপদ-আপদে এলাকার মানুষ ছুটে আসেন মায়ের এই শান্ত মন্দিরে। ভক্তদের দৃঢ় বিশ্বাস, খাঁটি মন থেকে ডাকলে মা কখনও কাউকে খালি হাতে ফেরান না। কলকাতার বুকেই আজও এভাবেই এক অদ্ভুত মায়া এবং অলৌকিক ভরসা ছড়িয়ে রেখেছেন ঘৌমে আবৃত দেবী কালী।