মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠকেই ধুন্ধুমার! রাজবংশী বনাম কামতাপুরী দ্বন্দ্বে ফের উত্তাল উত্তরবঙ্গের রাজনীতি

উত্তরবঙ্গের মাটি ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং উন্নয়নের রূপরেখা তৈরি করতে শিলিগুড়ির উত্তরকন্যায় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রাজবংশী ও কামতাপুরী সম্প্রদায়ের শীর্ষ প্রতিনিধিদের নিয়ে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসেছিলেন। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর এই বিশেষ উদ্যোগের পরেই দুই প্রভাবশালী সম্প্রদায়ের পারস্পরিক মতবিরোধ একেবারে প্রকাশ্যে চলে এসেছে। ফলস্বরূপ, উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক ও সামাজিক আবহ ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
উত্তরকন্যায় কী ঘটেছিল?
মঙ্গলবার শাখা সচিবালয় উত্তরকন্যায় আয়োজিত ওই বৈঠকে রাজবংশী সম্প্রদায়ের একাংশ মুখ্যমন্ত্রীর উদ্যোগকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানালেও, কামতাপুরী প্রতিনিধিদের অভিযোগ— রাজ্য সরকার সচেতনভাবে রাজবংশী সম্প্রদায়কে অতিরিক্ত অগ্রাধিকার দিয়ে তাঁদের দাবিকে কোণঠাসা করে রেখেছে।
বৈঠক শেষে সন্তোষ প্রকাশ করে রাজবংশী নেতা বংশীবদন বর্মণ জানান, দীর্ঘদিন ধরে অচল থাকা ‘রাজবংশী ভাষা অ্যাকাডেমি’ ও ‘রাজবংশী উন্নয়ন বোর্ড’ পুনর্গঠনের প্রশাসনিক আশ্বাসের পাশাপাশি আগামী ২৪ নভেম্বরের মধ্যে কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি, রাজবংশী ভাষাকে ভারতীয় সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে পূর্ববর্তী আলোচনার সূত্র ধরে খুব শীঘ্রই ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আশা প্রকাশ করেন তিনি। অতীতে কোনো সরকার উত্তরবঙ্গের এই জনজাতির কথা শুনতে এভাবে আলাদাভাবে এগিয়ে আসেনি বলে তিনি প্রশাসনের প্রশংসাও করেন।
কামতাপুরী নেতৃত্বের তীব্র অসন্তোষ ও ঐতিহাসিক যুক্তি
তবে বংশীবদন বর্মণের ঠিক বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে ক্ষোভ উগরে দেন কামতাপুরী নেতা তথা উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক বীরেন নারায়ণ রায়। তাঁর অভিযোগ, প্রশাসনিক এই বৈঠকে সার্বিক রাজবংশী নেতৃত্বকে একপেশেভাবে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে এবং কামতাপুরী প্রতিনিধিদের মতামত প্রকাশের সুযোগ কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
ভাষাগত বিতর্ক প্রসঙ্গে অধ্যাপক রায় স্পষ্ট ভাষায় জানান, রাজবংশী নাকি কামতাপুরী—কোন ভাষাটি বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য, তা কেবল কর্তার ইচ্ছায় স্থির হতে পারে না। ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকেই ‘কামরূপী-কামতা’ বা ‘কামতাপুরী’ ভাষা হিসেবে এই অঞ্চলের নিজস্ব অস্তিত্ব রয়েছে, যেখানে রাজবংশী জনজাতির অংশগ্রহণ শুরু হয় ১৮৫০ সালের পর থেকে। কামতাপুরীর মতো সর্বজনগ্রাহ্য নামের অধীনে ২২ থেকে ২৩টি সামাজিক গোষ্ঠী একত্রিত হতে পারে। নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়ের ওপর ভাষা চাপিয়ে দেওয়া হলে তা ভাষাগত আধিপত্যবাদকে উসকে দেয় বলে দাবি করেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রীর কড়া বার্তা ও নতুন প্রতিশ্রুতি
দুই পক্ষের এই অভ্যন্তরীণ উত্তাপের মাঝেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিগত সরকারের সমালোচনা করে বলেন, উত্তরবঙ্গের ভৌগোলিক ও সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট করতে নানা সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজন তৈরি করা হয়েছিল। রাই, লেপচা, তামাং বা নমঃশূদ্র বোর্ড গঠনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বিভক্ত রাখার যে রাজনৈতিক নীতি অতীতে চলেছে, উত্তরবঙ্গে রাজবংশী ও কামতাপুরীদের ক্ষেত্রেও সেই একই চাল চেলেছিল আগের সরকার।
ধর্মীয় ও ভাষাগত রাজনীতির বেড়াজাল ভেঙে উত্তরবঙ্গের পিছিয়ে পড়া মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ভূমির অধিকার সুরক্ষায় রাজ্য ও কেন্দ্রীয় স্তরে আইনি পদক্ষেপের আশ্বাস দেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই সঙ্গে ভূমি মাফিয়াদের কবল থেকে জমি উদ্ধার, আন্দোলনকারীদের নামে থাকা মিথ্যা পুলিশি মামলা প্রত্যাহার এবং রাজবংশী যুবকদের জন্য পুলিশ ও শিক্ষক পদে স্বচ্ছ নিয়োগের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। আইএএস, ডব্লিউবিসিএস অফিসার ও ভাষাবিদদের নিয়ে একটি স্বতন্ত্র উপদেষ্টা টিম গড়ে এই ভাষাগত জটিলতা সমাধানের যে বার্তা মুখ্যমন্ত্রী দিয়েছেন, তার পর উত্তরবঙ্গের অধিকার আন্দোলন কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার।