কেন এত কালো মা কালীর গায়ের রং? দেবী দুর্গার সঙ্গে তাঁর আসল সম্পর্কটা ঠিক কী?

সামনে আর মাত্র কয়েকদিনের অপেক্ষা। চারপাশ জুড়ে এখন কেবলই আলো ঝলমলে উৎসবের আমেজ। কোথাও দক্ষিণাকালী, কোথাও শ্যামাকালী, আবার কোথাও ভয়ংকরী চামুণ্ডা রূপে পূজিত হন দেবী। কিন্তু মনে মনে এই প্রশ্ন কি কখনো আপনারও জেগেছে—যিনি আরাধ্যা, তাঁর গায়ের রং কেন কুচকুচে কালো? দেবী দুর্গা বা পার্বতীর সঙ্গেই বা কালীর আসল সম্পর্ক কী? আর মহাদেব শিবের সঙ্গে দেবীর কথিত বিরোধের সঙ্গে ঠিক কীভাবে জড়িয়ে রয়েছে দীপাবলির যোগ? বিশিষ্ট পুরাণবিদ সুচেতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক আলোচনায় উঠে এসেছে এই সমস্ত প্রশ্নের চমকপ্রদ ও গভীর কিছু ব্যাখ্যা।

কালো রং কি শুধুই ভয়ংকরতার প্রতীক?

দেবী কালীর প্রকৃত স্বরূপ বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে প্রাচীন ‘কালিকাপুরাণে’। এই পুরাণের সঙ্গে বাংলার পাশাপাশি অসমের ধর্মীয় ও তন্ত্র সাধনার এক গভীর যোগ রয়েছে। কামাখ্যা উপাসনা থেকে শুরু করে শক্তির আরাধনার নানা দিক এই পুরাণে অত্যন্ত স্পষ্ট। সেখানে দুর্গাপুজোর পাশাপাশি দেবীর বিভিন্ন রূপের নিখুঁত বর্ণনাও পাওয়া যায়।

সাধারণত আমরা দেবী পার্বতীকে গৌরবর্ণা রূপেই কল্পনা করতে অভ্যস্ত। কিন্তু পৌরাণিক আখ্যান বলছে সম্পূর্ণ অন্য কথা। আদিতে পার্বতী কিন্তু কৃষ্ণবর্ণা বা শ্যামা ছিলেন! এমনকি মহাদেব শিব পরম স্নেহে তাঁকে ‘কালী’ বলেও সম্বোধন করতেন। দেবীর নামের ব্যাখ্যা খুঁজতে গেলেই এই পৌরাণিক তত্ত্ব সামনে আসে। পরবর্তীতে পার্বতীর গৌরবর্ণা হওয়ার তীব্র ইচ্ছা এবং সেই উদ্দেশ্যে তাঁর কঠোর তপস্যার কাহিনিও রয়েছে পুরাণে।

অর্থাৎ, কালী ও গৌরীকে সম্পূর্ণ আলাদা বা ভিন্ন দুই দেবী হিসেবে না দেখে, তাঁদের একই মহাশক্তির দুটি ভিন্ন প্রকাশ হিসেবেই ব্যাখ্যা করা যায়। একদিকে যেমন তিনি কৃষ্ণবর্ণা কালী, তেমনই অন্যদিকে তিনি উজ্জ্বল গৌরী। রূপের বহর বদলালেও শক্তির মূল উৎস কিন্তু এক এবং অভিন্ন।

কালরাত্রি, ভদ্রকালী ও দেবীর ভয়ংকরী রূপ

নবরাত্রিতে পূজিত দেবীর নয়টি রূপের অন্যতম হলো ‘কালরাত্রি’। এই রূপের বর্ণনা বেশ ভয়ংকর ও রোমহর্ষক। দেবীর গায়ের রং ঘুটঘুটে অন্ধকারের মতো কালো, চুল উন্মুক্ত, চোখ দীপ্তিময় এবং জিহ্বা বাইরে বেরিয়ে থাকে। স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের মনে এই রূপ ভয় তৈরি করতে পারে। তবে ধর্মীয় ও দার্শনিক ব্যাখ্যায় এই ভয়ংকরী রূপের আসল উদ্দেশ্য হলো অশুভ শক্তির বিনাশ করা।

অন্যদিকে, শারদীয়া দুর্গাপুজোর স্তোত্র ও মন্ত্রে দেবীকে ‘ভদ্রকালী’ নামেও স্মরণ করা হয়। অর্থাৎ, যাঁর রূপ বাইরে থেকে ভয়ংকর, তিনিই ভক্তের কাছে পরম মঙ্গলদায়িনী। এই দ্বৈত পরিচয়ই কালীর আরাধনার প্রধান বৈশিষ্ট্য। অন্ধকার এখানে কেবল ভয়ের প্রতীক নয়; অন্ধকারের গভীর গর্ভ থেকেই জন্ম নেয় আলোর বিস্ফোরণ। দেবীর কৃষ্ণবর্ণ রূপের মধ্যেও অনেকে সেই শাশ্বত দর্শন খুঁজে পান।

শিব-পার্বতীর বিরোধ থেকেই কি দীপাবলির শুরু?

কালীপুজোর সঙ্গে আলোর উৎসব দীপাবলির গভীর সম্পর্ক নিয়েও এক দারুণ পৌরাণিক তথ্য তুলে ধরেছেন সুচেতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কথিত আছে, এক সময়ে দেবাদিদেব শিব ও পার্বতীর মধ্যে এক গভীর মনোমালিন্য বা বিরোধ তৈরি হয়। অভিমানে মহাদেব অন্তর্হিত বা অদৃশ্য হয়ে যান। তাঁর ললাটের তিন নেত্রের জ্যোতিও যেন হারিয়ে যায়। আর তার ফলেই চারদিক গ্রাস করে গভীর অন্ধকার।

সেই সংকটময় পরিস্থিতিতে বিষ্ণু নিজের অন্তরের চেতনা থেকে প্রদীপ জ্বালানোর পরামর্শ দেন। এর পেছনে রয়েছে এক গভীর দার্শনিক তাৎপর্য। শুধু বাইরের ঘরের অন্ধকার দূর করা নয়, মানুষের নিজ অন্তরের অজ্ঞানতা ও অন্ধকার ঘুচিয়ে জ্ঞান ও চেতনাকে জাগিয়ে তোলার মাধ্যমেই মানবজীবনের প্রকৃত বিকাশ ঘটে। দীপাবলির রাতে প্রদীপ প্রজ্বলনের নেপথ্যেও লুকিয়ে রয়েছে এই সনাতন ভাবনা।

পৌরাণিক এই কাহিনীর প্রতীকী অর্থ অত্যন্ত গভীর। শিবকে এখানে সংযম, শান্তি ও প্রশান্তির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। অন্যদিকে, পার্বতী তথা কালী হলেন সৃষ্টির আদি শক্তির প্রকাশ। এই দুটি ভাবনা একে অপরের পরিপূরক। শক্তি ছাড়া সৃষ্টি সম্পূর্ণ হতে পারে না, আবার সংযম ও শৃঙ্খলা ছাড়া সেই শক্তির প্রকাশও ভারসাম্য হারাতে পারে।

বাংলার কালীপুজোর দর্শন কোথায় আলাদা?

ভারতের অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় বাংলার কালীপুজোর আবেদন ও আবেগ সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে কালী শুধু কোনো দূরবর্তী বা ভয়াল পুরাণের দেবী নন; তিনি ঘরের মেয়ে, পরিবারের রক্ষাকর্ত্রী এবং ঘোর বিপদের দিনে পরম ভরসার স্থল। তাই এখানে দেবীর ভয়ংকরী রূপের পাশাপাশি মাতৃরূপও সমানভাবে পূজিত হয়। শ্মশানকালী থেকে দক্ষিণাকালী, শ্যামাকালী থেকে রক্ষাকালী—নানান রূপে দেবীকে আপন করে নিয়েছেন আপামর বাঙালি।

কালীপুজো বা দীপাবলির রাতে যখন হাজার প্রদীপ ও আলোয় সেজে ওঠে চারপাশ, তখন তার অর্থ শুধুই উৎসবের আনন্দ নয়। পুরাণের ব্যাখ্যা অনুসারে, সেই আলোর রোশনি আমাদের ভেতরের অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর করে পরম জ্ঞান অর্জনের পথ দেখায়। তাই কৃষ্ণবর্ণা দেবীর আরাধনার গভীরেও সর্বদা লুকিয়ে রয়েছে আলোর তীব্র সন্ধান, আর সেই ভয়ংকরী রূপের আড়ালে রয়েছে মাতৃত্ব, শক্তি ও মঙ্গলের শাশ্বত আশীর্বাদ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *