“ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ!” দিয়া মির্জার দীপাবলির ভিডিও বিতর্কে বিজেপিকে সজোরে ঠুকে বম্বের হাইকোর্ট

বলিউড অভিনেত্রী দিয়া মির্জার (Dia Mirza) দীপাবলির বাজি-বিরোধী সচেতনতামূলক ভিডিও বিতর্ক এবং তাঁকে লক্ষ্য করে রাজনৈতিক নেতাদের কড়া আক্রমণের ঘটনায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করল বম্বে হাইকোর্ট। অভিনেত্রী ও প্রচারমূলক ভিডিওটির বিরুদ্ধে বিজেপি নেতাদের করা রাজনৈতিক মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে আদালত স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, “ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ।” এর পাশাপাশি বৃহন্মুম্বই পুরসভাকে (BMC) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সামাজিক মাধ্যম থেকে মুছে ফেলা দিয়া মির্জার ওই সচেতনতামূলক ভিডিওটি অবিলম্বে পুনর্বহাল করার জন্য।
ঘটনার সূত্রপাত ও আদালতের পর্যবেক্ষণ:
জনসাধারণকে রাস্তার ওপর বাজি না পোড়ানোর অনুরোধ জানিয়ে একটি সচেতনতামূলক ভিডিও রেকর্ড করেছিলেন অভিনেত্রী দিয়া মির্জা। তবে এই উদ্যোগ দিয়া নিজের ইচ্ছায় নেননি, বরং বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে হাইকোর্টের আগের নির্দেশ মেনে বৃহন্মুম্বই পুরসভার (BMC) অনুরোধেই তিনি এই ক্যাম্পেইনে অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু ভিডিওটি প্রকাশ পেতেই বিজেপি নেতাদের তীব্র আপত্তির মুখে তা সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট থেকে মুছে ফেলে বিএমসি।
সোমবার এই মামলার শুনানিতে বম্বে হাইকোর্টের বিচারপতি গিরিশ কুলকার্নি এবং বিচারপতি ডঃ নীলা গোখলের সমন্বয়ে গঠিত একটি ডিভিশন বেঞ্চ রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ায় গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করে। বেঞ্চ জানায়, “কিছু রাজনৈতিক নেতার অযাচিত মন্তব্যে আমরা গভীরভাবে ব্যথিত।” তাঁরা মনে করিয়ে দেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশ মেনেই তারকারা এই সচেতনতামূলক প্রচারে সামিল হয়েছিলেন।
বিচারপতি কুলকার্নি বলেন, “তিনি আদালতের নির্দেশ অনুসারেই কাজটি করেছিলেন।” অন্যদিকে বিচারপতি গোখলে স্পষ্ট করে দেন যে, এটি একেবারেই পরিবেশ সংক্রান্ত ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়। “প্রত্যেকে একই বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে, সে যেই হোক না কেন,” মন্তব্য করে রাজনৈতিক নেতাদের বিষয়টিকে অন্য কোনো রূপ না দেওয়ার কঠোর বার্তা দেন বিচারকরা।
বিজেপি ও মেয়রের বিস্ফোরক তোপ:
এর আগে ভিডিওটি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয় মুম্বই বিজেপির সভাপতি অমিত সাতমের আপত্তিতে। তিনি দাবি করেছিলেন, “দিয়া মির্জার কাছ থেকে দীপাবলি উদযাপনের পাঠ নিতে হবে না।” এরপর মুম্বইয়ের মেয়র রীতু তাউড়ে দিয়া মির্জাকে সরাসরি “অ্যান্টি-হিন্দুত্ববাদী” বা হিন্দুত্ব-বিরোধী বলে কটাক্ষ করেন এবং জানান যে তাঁকে “১০০% ব্ল্যাকলিস্ট” বা কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ভবিষ্যতে পুরসভার কোনো কর্মসূচিতে তাঁকে রাখা হবে না বলেও তিনি জানান।
মেয়র অবশ্য দাবি করেন, তাঁর এই আপত্তি অভিনেত্রীর ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। তিনি বলেন, “তিনি সবসময় হিন্দুত্ব এবং সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি নর্মদা প্রকল্প এবং অভিন্ন দেওয়ানি বিধির (UCC) বিরোধিতা করেছেন, এমনকি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বক্তব্যের বিরুদ্ধেও কথা বলেছেন। আমরা আমাদের দীপাবলি কীভাবে পালন করব তা শেখানোর জন্য দিয়া মির্জার প্রয়োজন নেই। বিজেপির মূল এজেন্ডা হলো হিন্দুত্ব, আর যারা এর বিরুদ্ধে যাবে তাদের বিরুদ্ধে আমরা পদক্ষেপ নেব।”
বিতর্ক নিয়ে কী বললেন দিয়া মির্জা?
আইনি ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের মাঝে একটি সংবাদ মাধ্যমকে দেওয়া একচেটিয়া সাক্ষাৎকারে দিয়া মির্জা তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেন, “দীপাবলি হলো অজ্ঞতার ওপর জ্ঞানের এবং অন্ধকারের ওপর আলোর জয়ের উৎসব। জনস্বার্থেই এই ভিডিওটি শুট করা হয়েছিল, যাতে সবাই আরও স্বাস্থ্যকর ও সচেতনভাবে উৎসব উদযাপন করতে পারেন। বায়ুদূষণ একটি সার্বজনীন জনস্বাস্থ্য সমস্যা এবং এটি কমানোর প্রতিটি পদক্ষেপই সবার জন্য এক উন্নত পরিবেশ তৈরি করে।”
অবশেষে বম্বে হাইকোর্টের এই কড়া অবস্থান ও ভিডিও পুনর্বহালের নির্দেশকে পরিবেশ সচেতনতা এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝে এক তাৎপর্যপূর্ণ জয় হিসেবেই দেখছে রাজনৈতিক ও বিশেষজ্ঞ মহল।