কালীপুজোয় বাজি ফাটানোর সময় মাত্র ২ ঘণ্টা! রাতারাতি বড় নির্দেশিকা জারি করল নবান্ন

দীপাবলির রাতে আর ইচ্ছেমতো বাজি ফাটানোর জো নেই। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং উৎসবের মরশুমে যেকোনো ধরনের অনভিপ্রেত দুর্ঘটনা এড়াতে আগেভাগেই একগুচ্ছ কঠোর নির্দেশিকা জারি করল রাজ্য সরকার। আগামী ৮ নভেম্বর, রবিবার রাজ্যজুড়ে পালিত হবে কালীপুজো। তার ঠিক আগেই নবান্নে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক বৈঠকে বাজি পোড়ানোর নির্দিষ্ট সময়সীমা, ফানুস ওড়ানো এবং অস্থায়ী বাজি বাজারগুলির নিরাপত্তা নিয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রসচিব সঙ্ঘমিত্রা ঘোষ। প্রশাসন সাফ জানিয়ে দিয়েছে, সরকারি নির্দেশ বা নিয়ম অমান্য করলে কড়া আইনি পদক্ষেপ করা হবে।
রাজ্য সরকারের নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, কালীপুজোর দিন রাতে মাত্র দুই ঘণ্টার জন্য বাজি ফাটানোর অনুমতি মিলবে। রাত ৮টা থেকে শুরু করে রাত ১০টা পর্যন্তই কেবল বাজি পোড়ানো যাবে। এর বাইরে অন্য কোনো সময়ে বাজি ফাটালে তা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
পাশাপাশি, ছটপুজোর পবিত্র উৎসবের জন্যও আলাদা সময় নির্ধারিত করা হয়েছে। সেই দিন সকালে সূর্যোদয়ের সময় অর্থাৎ ভোর ৬টা থেকে সকাল ৮টার মধ্যে শুধুমাত্র বাজি পোড়ানো যাবে। নির্ধারিত এই সময়সীমার বাইরে কেউ বাজি ফোটালে স্থানীয় প্রশাসন তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেবে।
হাসপাতাল ও স্কুলের কাছে শব্দবাজি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
শুধুমাত্র সময়ের গণ্ডি মানলেই চলবে না, পরিবেশ রক্ষা ও শব্দদূষণ রোধে কঠোর নজরদারি চালাবে প্রশাসন। আইন অনুযায়ী, রাজ্যের সমস্ত ‘সাইলেন্স জোন’ বা নীরবতা এলাকায় বিশেষ কড়াকড়ি থাকবে। স্কুল, কলেজ এবং হাসপাতাল চত্বরের ১০০ মিটারের ব্যাসার্ধের মধ্যে কোনো অবস্থাতেই শব্দবাজি ফাটানো যাবে না। বিশেষ করে অসুস্থ রোগী, ছোট শিশু এবং প্রবীণ নাগরিকদের স্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখেই এই বিশেষ বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এছাড়া কোথাও নিষিদ্ধ বা অতিরিক্ত মাত্রার শব্দবাজি বিক্রি হচ্ছে কি না এবং লাইসেন্সপ্রাপ্ত বাজি বাজারগুলিতে সমস্ত অগ্নিবিধি ঠিকঠাক মানা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখবে পুলিশ ও প্রশাসন।
ফানুস ও বাজি বাজারেও কঠোর নজরদারি
গত কয়েক বছর ধরে কালীপুজো বা দীপাবলির রাতে ফানুস ওড়ানোর প্রবণতা বিপজ্জনক হারে বেড়েছে। কিন্তু কাগজের তৈরি এই ফানুসগুলির নির্দিষ্ট কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় এগুলি বহুদূরে উড়ে গিয়ে কোনো জনবসতি বা দাহ্য পদার্থের ওপর পড়ে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের কারণ হতে পারে। সেই কারণে এবার থেকে ইচ্ছেমতো ফানুস ওড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পুলিশের ডিজি স্পষ্ট জানিয়েছেন, ফানুস ওড়াতে গেলে এবার থেকে নির্দিষ্ট লাইসেন্স বা অনুমতি নিতে হবে।
পাশাপাশি, শহরের যেখানেই অস্থায়ী বাজি বাজার বসবে, সেই জায়গার নিরাপত্তা আগে থেকেই নিশ্চিত করবে পুলিশ, প্রশাসন এবং স্থানীয় পৌরসভা। প্রতিটি বাজি বাজারে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা (ফায়ার সেফটি) এবং আপৎকালীন চিকিৎসার জন্য অ্যাম্বুল্যান্স মজুত রাখার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কেন এই কড়া বিধিনিষেধ?
প্রশাসনের মতে, কালীপুজো ও ছটপুজোর সময় একসঙ্গে রাজ্যের হাজার হাজার এলাকায় দেদার বাজি পোড়ানো হয়, যার ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই পরিবেশের দূষণের মাত্রা চরম সীমায় পৌঁছে যায়। বাতাসে বিষাক্ত ধোঁয়া ও শব্দের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় হাসপাতালের চিকিৎসাধীন রোগী, পরীক্ষার্থী এবং বয়স্ক মানুষদের মারাত্মক কষ্ট হয়। এছাড়া ঘনবসতিপূর্ণ এবং ঘিঞ্জি এলাকায় অসাবধানতাবশত বাজি পোড়ানোর ফলে মুহূর্তের মধ্যে আগুন লেগে যাওয়ার বা সাধারণ মানুষের আহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
উৎসবের আনন্দ যেন কোনোভাবেই অন্য কোনো মানুষের বিপদের বা চরম অসুবিধার কারণ হয়ে না দাঁড়ায়, সেটাই এই নির্দেশিকা জারির মূল লক্ষ্য। তাই ক্রেতা থেকে বিক্রেতা—সব পক্ষকেই বাজি কেনা থেকে শুরু করে পোড়ানোর প্রতিটি ধাপে দায়িত্বশীল হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে রাজ্য প্রশাসন।