একই মণ্ডপে দুই বোন! পানের বরজে ঘেরা গ্রামে ৩০০ বছর ধরে জোড়া কালীর আশ্চর্য মহিমা, জানলে অবাক হবেন

পূর্ব মেদিনীপুর মানেই কেবল দিঘা বা মন্দারমণি নয়; উপকূলীয় এই জেলার অন্দরে লুকিয়ে রয়েছে বহু প্রাচীন ঐতিহ্য ও লোকবিশ্বাসের গল্প। এমনই এক অবিশ্বাস্য ও রোমাঞ্চকর ইতিহাসের সাক্ষী পটাশপুরের পালপাড়া গ্রাম। পানের বরজে ঘেরা এই শান্ত গ্রামে প্রায় ৩০০ বছর ধরে উদযাপিত হয়ে আসছে জোড়া কালীপুজো। সাবেকিয়ানা আর অলৌকিক বিশ্বাসের মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই পুজোর সবচেয়ে বড় চমক—এখানে কোনো রক্তক্ষয়ী পশুবলি হয় না! বদলে ভক্তদের মনস্কামনা পূরণ হলে মায়ের নামে ছেড়ে দেওয়া হয় জীবন্ত পাঁঠা।
মহামারী রুখতে স্বপ্নাদেশ! যেভাবে শুরু হয়েছিল পুজো
স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, প্রায় তিনশো বছর আগে এক ভয়াবহ মহামারীর কবলে পড়েছিল সমগ্র এলাকা। কলেরা ও বসন্তের মারণ কামড়ে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যাচ্ছিল। সেই কঠিন সময়ে গ্রামের মোড়ল ও প্রবীণরা রাতে স্বপ্নাদেশ পান—গ্রামের শেষ প্রান্তে জোড়া কালী প্রতিষ্ঠা করে পুজো দিলে তবেই মিলবে রক্ষা।
যেমন ভাবনা, তেমনই কাজ। এরপরই শুরু হয় আরাধনা। অলৌকিকভাবে পুজো শুরুর পরপরই কমতে শুরু করে মহামারীর প্রকোপ। সেই থেকেই পালপাড়ার মানুষের কাছে এই জোড়া কালী অত্যন্ত জাগ্রত বলে বিবেচিত হয়ে আসছে।
কেন ‘জোড়া কালী’? দুই বোনের পুজো একই মণ্ডপে
এখানে একই মণ্ডপে পাশাপাশি দুটি কালী মূর্তির পুজো করা হয়। একটি বড় কালী এবং অন্যটি ছোট কালী। গ্রামবাসীর দৃঢ় বিশ্বাস, দুই মূর্তি আসলে দুই বোন। বড় বোন গ্রামকে সব ধরণের বহিরাগত বিপদ থেকে রক্ষা করেন, আর ছোট বোন আগলে রাখেন পরিবারের সুখ, সমৃদ্ধি ও সন্তানদের। তাই কালীপুজোর রাতে দুই বোনের একসঙ্গে আরাধনা না হলে পুজো অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
বলি বন্ধ, উৎসর্গিত পাঁঠা ঘুরে বেড়ায় মুক্ত হয়ে!
এই পুজোর প্রধান আকর্ষণ হলো এর অনন্য মানত প্রথা। বহুকাল আগে এখানে বলি প্রথা চালু থাকলেও, বহু বছর আগে গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠদের সিদ্ধান্তে তা চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ভক্তের মানত পূরণ হলে তিনি একটি জীবন্ত পাঁঠা কিনে মায়ের চরণে উৎসর্গ করেন। পুরোহিত মন্ত্রপূত জল ছিটিয়ে পাঁঠাটিকে ‘মায়ের পাঁঠা’ হিসেবে স্বাধীন ছেড়ে দেন। সেই পাঁঠাকে আর কখনো কাটা বা বলি দেওয়া হয় না। তারা পুরো গ্রামজুড়ে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ায়। এমনকি তারা জমির ফসল খেয়ে ফেললেও কোনো গ্রামবাসী তাদের গায়ে হাত তোলেন না! বর্তমানে গ্রামে এরকম প্রায় ৫০টিরও বেশি ‘মায়ের পাঁঠা’ ঘুরে বেড়ায়, যা কালীপুজোর দিন মণ্ডপের চারপাশে অবাধে বিচরণ করতে দেখা যায়।
আজও অটুট সাবেকিয়ানা
আধুনিক থিমের ভিড়ে হারিয়ে না গিয়ে আজও নিজের সাবেকিয়ানা বজায় রেখেছে পালপাড়ার জোড়া কালী। আজও মাটির প্রতিমায় ঐতিহ্যবাহী ডাকের সাজে সাজিয়ে তোলা হয় দুই দেবীকে। পুজো উপলক্ষে কেবল পালপাড়া নয়, আশেপাশের ১০-১২টি গ্রামের হাজার হাজার মানুষের সমাগমে ছোট্ট গ্রামটি মেলায় রূপ নেয়।
শহরের কোলাহল আর থিমের জাঁকজমক থেকে দূরে গিয়ে যদি বাংলার খাঁটি গ্রামীণ ভক্তি আর লোকবিশ্বাসের স্বাদ নিতে চান, তবে পানের বরজের গন্ধে মাতোয়ারা পটাশপুরের এই ঐতিহাসিক পালপাড়া গ্রাম আপনার জন্য হতে পারে এক অনন্য গন্তব্য।