ব্যবসার টাকার বখরা নিয়ে রক্তারক্তি! বাদুড়িয়ায় চাঞ্চল্যকর কান্ড ঘটিয়ে জনতার হাতে মার খেল অভিযুক্ত

অংশীদারিত্বে চলা গাড়ির ব্যবসার আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে ঘটল এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী কাণ্ড। চায়ের দোকানে বসে থাকা অবস্থায় মুহূর্তের নোটিশে ভারী হাতুড়ি দিয়ে এক অংশীদারের মাথায় প্রাণঘাতী আঘাত করার অভিযোগ উঠল অপর অংশীদারের বিরুদ্ধে। সোমবার উত্তর ২৪ পরগনার বাদুড়িয়া থানার হুগলি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটেছে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় আক্রান্ত ব্যবসায়ী বর্তমানে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। এদিকে ঘটনার পর এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে, উত্তেজিত জনতা অভিযুক্তকে ধরে বেধড়ক মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।

বাদুড়িয়া থানার এক পুলিশ আধিকারিক জানিয়েছেন, অভিযুক্ত আরিফুল মণ্ডলকে গ্রেফতার করে ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে। শুধুই ব্যবসায়িক আর্থিক লেনদেনের বখরা নিয়ে বিরোধ, নাকি এই হামলার নেপথ্যে অন্য কোনো পুরনো শত্রুতা বা ব্যক্তিগত ক্ষোভ লুকিয়ে রয়েছে—সব দিক খতিয়ে দেখতে ধৃতকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

ঠিক কী ঘটেছিল চাঞ্চল্যকর ওই মুহূর্তে?

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, হুগলি গ্রামের বাসিন্দা সাইফুদ্দিন মণ্ডলের সঙ্গে আরিফুল মণ্ডলের যৌথ অংশীদারিত্বে একটি বাণিজ্যিক গাড়ি ছিল। সেই গাড়ি চালানো ও তার আয়-ব্যয়ের আর্থিক হিসাবনিকাশ নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই দু’জনের মধ্যে চরম টানাপোড়েন ও অশান্তি চলছিল।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, ঘটনার দিন হুগলি গ্রামের একটি চায়ের দোকানে অন্যান্য দিনের মতোই বসেছিলেন সাইফুদ্দিন। দোকানে সেই সময় পাঁচ-সাতজন স্থানীয় লোক উপস্থিত ছিলেন। কোনো বড় কথা কাটাকাটি বা বচসা ছাড়াই হঠাৎ করেই পাশের একটি লেদ কারখানা থেকে প্রায় পাঁচ কেজি ওজনের একটি ভারী হাতুড়ি তুলে নিয়ে আসে আরিফুল। এরপর কোনো কিছু বুঝে ওঠার সুযোগ না দিয়েই সে সজোরে সাইফুদ্দিনের মাথায় এলোপাথাড়ি আঘাত করতে থাকে।

উত্তেজিত জনতার মার ও পুলিশের হস্তিক্ষেপ

হাতুড়ির মুহুর্মুহু আঘাতে মাথা ফেটে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন সাইফুদ্দিন। সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে হাতেনাতে পাকড়াও করেন আরিফুলকে। এরপর একটি ঘরে তাকে আটকে রেখে স্থানীয়রা উত্তম-মধ্যম দেন। অন্যদিকে, অত্যন্ত সংকটজনক ও সংজ্ঞাহীন অবস্থায় সাইফুদ্দিনকে দ্রুত উদ্ধার করে বসিরহাট মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং মাথায় গভীর ক্ষতের কারণে তাঁর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। এদিকে খবর পেয়ে বাদুড়িয়া থানার পুলিশ অভিযুক্ত আরিফুলকে উদ্ধার করতে ঘটনাস্থলে পৌঁছলে স্থানীয় গ্রামবাসীদের প্রবল ক্ষোভ ও প্রতিরোধের মুখে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় এলাকায় নামাতে হয় বাড়তি পুলিশ বাহিনী ও র‍্যাফ (RAF)। শেষ পর্যন্ত কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে পুলিশ অভিযুক্তকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায় এবং গ্রেফতার করে।

কী বলছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা?

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী গ্রামবাসী কাইয়ুম আলি গাজী জানান, “ওরা চায়ের দোকানে বসেছিল। পার্টনারের গাড়ি নিয়ে অনেক দিন ধরেই ওদের মধ্যে ঝামেলা চলছিল। হঠাৎ পাশের লেদ থেকে প্রায় পাঁচ কেজি ওজনের ভারী হাতুড়ি এনে কোনো কথা না বলেই সজোরে সাইফুদ্দিনের মাথায় বসিয়ে দেয় আরিফুল। প্রচণ্ড রক্তপাত হতে থাকায় আমরা তৎক্ষণাৎ তাঁকে বসিরহাট হাসপাতালে পাঠাই। আক্রান্ত সাইফুদ্দিন অত্যন্ত গরিব মানুষ এবং তাঁর পরিবার রয়েছে, তাই আমরা অবিলম্বে কঠোরতম শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।”

অপর এক গ্রামবাসী আলি আহমেদ বিশ্বাসের কথায়, “দোকানে পাঁচ-সাতজন লোক বসে ছিল, কোনো বড় বচসাও হয়নি। কথা বলতে বলতেই হঠাৎ হাতুড়ি এনে মাথায় মেরে দেয় আরিফুল। মূলত গাড়ির টাকা-পয়সার লেনদেন নিয়েই এই কাণ্ড। মারধরের পরই সাধারণ মানুষ আরিফুলকে ধরে আটকে রাখে এবং আহতকে হাসপাতালে পাঠায়।”

পুলিশ সূত্রে খবর, ধৃত আরিফুল মণ্ডলকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে ঘটনার পেছনের আসল সত্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে। গাড়ির ব্যবসার আর্থিক লেনদেনের বিরোধ নাকি অন্য কোনো পুরোনো শত্রুতা—পুলিশ সমস্ত দিক খতিয়ে দেখে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *