শালী, ডাঙা না কি বাস্তু? জমির আসল চরিত্র চিনতে এবার এক ক্লিকেই সমাধান, ঐতিহাসিক বদল আনল রাজ্য

জমি কেনাবেচা বা বাড়ি তৈরির আগে জমির আসল চরিত্র বুঝতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আইনি ও দাপ্তরিক জটিলতার মুখে পড়তে হয়। এতদিন খতিয়ানে লেখা জমির পুরনো বা প্রচলিত শ্রেণিবিভাগ দেখে সহজে বোঝা যেত না সেটি আসলে কী ধরনের জমি। সেই দীর্ঘদিনের জটিলতা ও বিভ্রান্তি কাটাতে এবার খতিয়ান বা রেকর্ড অব রাইটস (RoR)-এ বড়সড় বদল আনতে চলেছে নবান্ন। রাজ্যের সমস্ত জমির শ্রেণifকে নির্দিষ্ট ১৬টি বৃহত্তর ভাগে চিহ্নিত করার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তর।

খতিয়ানে যোগ হচ্ছে ‘সুপ্রা ক্যাটেগরি’ (Supra Category)

ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিকর্তা এবং যুগ্ম ভূমি সংস্কার কমিশনারের জারি করা সাম্প্রতিক নির্দেশিকায় এই নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর রূপরেখা স্পষ্ট করা হয়েছে। রাজ্যের ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থা এবং ভূমি দপ্তরের নিজস্ব ‘ই-ভূচিত্র’ পোর্টালে এর জন্য প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, নতুন নিয়মে জমির মূল বা প্রচলিত সাবেক চরিত্র কিন্তু আরওআরে বদলে যাবে না, তা যেমন ছিল তেমনই থাকবে। তবে তার পাশেই যুক্ত হবে ‘সুপ্রা ক্যাটেগরি’ নামের একটি নতুন কলাম। ফলে খতিয়ানের পুরনো ভাষা না বুঝলেও সাধারণ মানুষ এবং সরকারি আধিকারিকরা এখন থেকে এক নজরেই জমির আসল ধরন বুঝে নিতে পারবেন।

কোন কোন ১৬টি শ্রেণিতে ভাগ হচ্ছে জমি?

নবান্ন সূত্রে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, রাজ্যজুড়ে চিহ্নিত এই ১৬টি মূল ও সমন্বিত শ্রেণিগুলি হলো:

  • কৃষি ও কৃষি-সংলগ্ন: শালী, শুনা, ডাঙা, আউশ কিংবা আমন ইত্যাদি জমিগুলি এক ছাতার তলায় এসে সরাসরি ‘কৃষি’ বিভাগে চলে যাবে।

  • বসতবাড়ি: বাস্তু, বসতভিটে, আবাসন, টাউনশিপ, কোয়ার্টার বা হস্টেল।

  • শিল্প: চালকল, কোল্ড স্টোরেজ, কারখানা, ক্রাশিং ইউনিট, কাঠ চেরাই কল কিংবা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক।

  • বাণিজ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক: স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, গ্রন্থাগার, ডাকঘর, রেল স্টেশন, বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা থানা।

  • জলাশয়: পুকুর, দিঘি, খাল, জলাভূমি, ঝোরা বা নয়ানজুলি।

  • জনকল্যাণমূলক ও অন্যান্য: রাস্তাঘাট, ব্রিজ, বাসস্ট্যান্ড, পার্ক, শ্মশান, কবরস্থান, ডাম্পিং গ্রাউন্ড, ফলের বাগান, বনভূমি, নদী, পতিত জমি, মাঠ, চা বাগান এবং অন্যান্য ধর্মীয় স্থান।

প্রশাসনের কড়া সতর্কবার্তা ও নীতি আয়োগের পরামর্শ

জেলাস্তরে এই কাজ সুচারুভাবে পরিচালনা করতে জেলা ভূমি ও ভূমি সংস্কার আধিকারিকদের বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে প্রশাসন পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, খতিয়ানে এই ‘সুপ্রা ক্যাটেগরি’ যুক্ত হওয়ার মানে এই নয় যে জমির আইনি চরিত্র রাতারাতি বদলে গেল। অর্থাৎ, জমির মালিকানা স্বত্ব বা ব্যবহারের আইনি অধিকার এতে একা একা পরিবর্তিত হবে না এবং অনুমতি ছাড়া জমির ঘোষিত চরিত্র বদলানো সম্পূর্ণ বেআইনি হিসেবেই গণ্য করা হবে।

নবান্নের শীর্ষমহল জানাচ্ছে, রাজ্যে শিল্পায়ন এবং সার্বিক ভূমি নীতির সংস্কারে নীতি আয়োগ দীর্ঘদিন ধরেই এই ধরনের সমন্বিত রূপরেখা তৈরির পরামর্শ দিচ্ছিল। জমির লেনদেন সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও সহজ করতে সরকারের এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *