ইউরোপের ৬টি দেশে ভয়াবহ সংঘর্ষ, অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি সামলাতে নাজেহাল প্রশাসন!

জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি, আকাশছোঁয়া বাড়িভাড়া, কম বেতন এবং শিক্ষা ব্যবস্থার অব্যবস্থার জেরে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠল ইউরোপের একাধিক দেশ। শনিবার ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল, আলবেনিয়া ও বেলজিয়ামের বিভিন্ন শহরের রাজপথে নেমে আসেন লক্ষ লক্ষ মানুষ। শান্তিপূর্ণ আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও বহু জায়গায় তা চরম হিংসাত্মক রূপ নেয়। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, দোকান ভাঙচুর, লুটপাট এবং ব্যাপক অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পরিস্থিতি সামাল দিতে ময়দানে নামাতে হয়েছে অতিরিক্ত নিরাপত্তাবাহিনী ও সেনাকে।

ফ্রান্সে ১০০০ গ্রেপ্তার, কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান:

চলতি বিক্ষোভে সবচেয়ে বেশি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ফ্রান্স। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, শনিবারের বিক্ষোভে প্রায় ৪ লক্ষ ১০ হাজার মানুষ অংশ নিলেও শ্রমিক সংগঠনগুলির দাবি, এই সংখ্যাটা প্রায় ৮ লক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশকর্মী মোতায়েন করা হয়েছিল।

দিনের বেলা জমায়েত কিছুটা শান্ত থাকলেও সন্ধ্যার পর প্যারিস, মার্সেই, বোর্দো ও লিয়ঁ-র মতো শহরে প্রবল সংঘর্ষ শুরু হয়। প্যারিসে বিক্ষোভকারীদের একাংশ ব্যারিকেড ভেঙে পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ছোড়ে এবং গাড়ির শোরুমের কাচ ভাঙচুর করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। ফরাসি প্রশাসনের দাবি, প্রায় ১০০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ধৃতদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

ইতালিতে অতিরিক্ত ৫০০ সেনা মোতায়েন:

জীবনযাত্রার খরচ, কম বেতন এবং সামরিক খাতে ব্যয়ের প্রতিবাদে ইতালির মিলান, রোম ও তুরিনে বড়সড় বিক্ষোভ হয়। গত সপ্তাহের লুটপাটের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে মিলানে নিরাপত্তা আরও জোরদার করেছেন প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। শহরে অতিরিক্ত ৫০০ সেনা মোতায়েনের পাশাপাশি ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি চালানো হচ্ছে। সম্ভাব্য লুটপাটের আশঙ্কায় অ্যাপল স্টোর সহ একাধিক বিলাসবহুল দোকান কাঠের বোর্ড দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। রোম ও তুরিনে বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে আতশবাজি ও পাথর ছোড়ায় প্রশাসন কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করতে বাধ্য হয়। গাজা যুদ্ধের প্রতিবাদে কলোসিয়াম চত্বরেও বিক্ষোভ দেখান বহু শিক্ষার্থী।

বার্সেলোনা ও ব্রাসেলসেও তীব্র তাণ্ডব:

স্পেনের বার্সেলোনায় পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে। মুখ ঢাকা বিক্ষোভকারীদের একাংশের বিরুদ্ধে দোকানে লুটপাট এবং ৩০টিরও বেশি জায়গায় আগুন লাগানোর অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় প্রায় ১০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার এক-চতুর্থাংশই নাবালক। মাদ্রিদেও পেনশন ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে পথে নামেন ২৫ হাজারেরও বেশি মানুষ।

অন্যদিকে, পর্তুগালের লিসবনে আকাশছোঁয়া বাড়িভাড়া ও সম্পত্তির দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ দেখালেও সেখানে বড় কোনো হিংসার খবর নেই। আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় টিউশন ফি কমানো এবং প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে ছাত্র-বিক্ষোভ চলাকালীন পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। বেলজিয়ামের ব্রাসেলসেও ছাত্রদের ব্যারিকেড সরাতে পুলিশকে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করতে হয়।

সব মিলিয়ে, ইউরোপের পরপর কয়েকটি দেশে এই লাগাতার বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ প্রশাসনগুলির কাছে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনজীবন স্তব্ধ করে দেওয়া এই অসন্তোষ দমনে প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ নিলেও, সাধারণ মানুষের ক্ষোভের মূল কারণগুলি দূর না হলে পরিস্থিতি যে ফের বিস্ফোরক হয়ে উঠতে পারে, তা নিয়ে আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *