‘ভারত এক হাতে, পাকিস্তান অন্য হাতে!’ মুইজ্জুর নতুন চাল দেখে মাথায় হাত নয়াদিল্লির

মালদ্বীপ এখন আর এক বা দুই নৌকায় নয়, আক্ষরিক অর্থেই তিন নৌকায় পা দিয়ে চলার বিপজ্জনক খেলায় মজেছে। একদিকে ভারতকে বন্ধুত্বের ভান করে একই পরিকাঠামো প্রকল্পে চিনকে এন্ট্রি দিচ্ছে, আর অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে গড়ে তুলছে গোপন ও গভীর সখ্য। সম্প্রতি মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মহম্মদ মুইজ্জুর এই দ্বিমুখী কূটনৈতিক চাল এখন আন্তর্জাতিক মহলে সম্পূর্ণ প্রকাশ্যে।
গত ২০ থেকে ২২ অক্টোবর তিনদিনের পাকিস্তান সফর সেরে এলেন মুইজ্জু। আর সেই সফরেই ইসলামাবাদকে সঙ্গে নিয়ে নয়াদিল্লির কৌশলগত চিন্তার কারণ বাড়িয়ে দিলেন তিনি।
পাক মুলুকে মুইজ্জুর মেগা ভিজিট ও ২০টি চুক্তি
পাকিস্তান সফরে গিয়ে শুধু পাক প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সঙ্গেই নয়, উপ-প্রধানমন্ত্রী ইশাক দার এবং দেশের প্রভাবশালী সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গেও রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন মুইজ্জু। গত ১১ বছরের মধ্যে এই প্রথম মালদ্বীপের কোনো রাষ্ট্রপ্রধান পাকিস্তান সফর করলেন। ১৯৬৬ সাল থেকে শুরু হওয়া কূটনৈতিক সম্পর্কের ৬০ বছর পূর্তির আবহে এই সফরকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে ইসলামাবাদ।
সফরের দ্বিতীয় দিনে পাক প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে দুই নেতার উপস্থিতিতে প্রতিরক্ষা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, পুলিশি সহযোগিতা, অসামরিক বিমান পরিবহণ, বাণিজ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং মৎস্যচাষসহ মোট ২০টি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি (MoU) ও সমঝোতাপত্র স্বাক্ষরিত হয়। আগামী দু’বছরের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ১ কোটি ৩০ লক্ষ ডলার থেকে বাড়িয়ে ২০ কোটি ডলারে নিয়ে যাওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যও নিয়েছে এই দুই দেশ। এছাড়াও, পাকিস্তানের একটি ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মহম্মদ মুইজ্জুকে সম্মানজনক ডক্টরেট উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এই সফরে দীর্ঘদিন ধরে কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকা দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (SAARC)-কে পুনরুজ্জীবিত করার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট। যা দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে সমীকরণ বদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ভারতের প্রজেক্টে চিনকে এন্ট্রি, দোস্তি পাকিস্তানের সঙ্গে
ভারতের সঙ্গে একসময়ে ‘ইন্ডিয়া আউট’ ক্যাম্পেনকে হাতিয়ার করে দূরত্ব তৈরি করলেও পরবর্তীকালে সেই বরফ কিছুটা গলানোর চেষ্টা করেছিলেন মুইজ্জু। ভারতের আর্থিক সহায়তায় চলা গ্রেটার মালে কানেক্টিভিটি প্রজেক্টের ভূয়সী প্রশংসাও করেছিলেন তিনি। কিন্তু কূটনীতির আড়ালে তাঁর চাল দেখলে স্পষ্ট হয় যে তিনি দিল্লির আস্থা অর্জনের নাটক করলেও, গোপনে বেজিং ও ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও নিবিড় করছেন।
উদাহরণস্বরূপ, ভারতের এক্সিম ব্যাঙ্কের অর্থ ও অনুদানে তৈরি হওয়া গ্রেটার মালে কানেক্টিভিটি প্রজেক্টের অন্যতম প্রধান অংশ থিলাফুশি বন্দরের উন্নয়নের কাজের বরাত মালদ্বীপ সরকার তুলে দিয়েছে চিনের হাতে। অর্থাৎ, একই প্রকল্পে ভারত ও চিন—উভয়কেই জায়গা করে দিচ্ছে মালের বর্তমান প্রশাসন। আর এবার সেই তালিকায় নতুন সংযোজন হলো পাকিস্তান।
পাকিস্তানের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে ভারতের উদ্বেগ
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বর্তমান চুক্তিগুলিতে সরাসরি কোনো পাক সামরিক উপস্থিতি বা ঘাঁটির কথা না থাকলেও, ভারত মহাসাগরের এই সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জলপথে ইসলামাবাদের কৌশলগত প্রভাব বাড়ার আশঙ্কা প্রবল। ভারতের ফ্ল্যাগশিপ প্রজেক্ট এবং কৌশলগত সামুদ্রিক নিরাপত্তার পরিধিতে পাকিস্তানের এই নতুন প্রবেশ নিশ্চিতভাবেই নয়াদিল্লির কাছে বড় উদ্বেগের বিষয়।
পাকিস্তানের প্রেস ইনফরমেশন ডিপার্টমেন্টের বিবৃতিতে জম্মু-কাশ্মীর ও সিন্ধু জলচুক্তি নিয়ে পাকিস্তানের পুরনো অবস্থান সামনে আনা হলেও, মুইজ্জু এই বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। তা সত্ত্বেও, মালদ্বীপের এই ত্রিমুখী কূটনীতি যে ভারত মহাসাগরের জলসীমায় আগামী দিনে বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে, তা বলাই বাহুল্য।