বিয়ের পরেই বাবার সম্পত্তির অধিকার শেষ? নিজের কেনা বাড়ি আর পৈতৃক ভিটে নিয়ে বিরাট আইনি নিয়ম!

বাবার কেনা বাড়ি আর পৈতৃক সম্পত্তি: কোনটিতে বিবাহিত মেয়েদের কতটা অধিকার? জেনে নিন আইনের স্পষ্ট ব্যাখ্যা
ভারতীয় সমাজে দীর্ঘদিন ধরে একটি ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত—মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলেই বাপের বাড়ির সম্পত্তিতে তাঁর আর কোনও অধিকার থাকে না। অনেকেই মনে করেন, বিয়ের সময় গয়না কিংবা উপহার দিলেই মেয়ের প্রাপ্য চুকিয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু ভারতের আইন কি সত্যিই তাই বলে?
হিন্দু উত্তরাধিকার আইন এবং সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায় অনুযায়ী, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। তবে এই অধিকার পুরোপুরি নির্ভর করে সম্পত্তির ধরন—অর্থাৎ সম্পত্তিটি ‘পৈতৃক’ নাকি বাবার ‘স্ব-অর্জিত’—তার ওপর।
১. পৈতৃক সম্পত্তিতে জন্মসূত্রে ছেলের সমান অধিকার
বংশপরম্পরায় পাওয়া যৌথ পারিবারিক বা পৈতৃক সম্পত্তিতে (Ancestral Property) পুত্র ও কন্যার অধিকার একেবারেই সমান।
-
২০০৫ সালের সংশোধনী: হিন্দু উত্তরাধিকার আইন, ১৯৫৬-এর ২০০৫ সালের সংশোধনে কন্যাদেরও ‘কোপারসনার’ (Coparcener) বা সহ-উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, ভাইয়ের যেটুকু অধিকার, বোনেরও ঠিক সেটুকুই অধিকার।
-
বিয়ে হলেও অধিকার কমে না: কন্যা বিবাহিত নাকি অবিবাহিত, তা পৈতৃক সম্পত্তির ক্ষেত্রে বিবেচ্য নয়। বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরও পৈতৃক সম্পত্তিতে দাবি বজায় থাকে।
-
সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়: একসময় বিভ্রান্তি ছিল যে ২০০৫ সালের সংশোধনের সময় বাবা জীবিত না থাকলে মেয়ে ভাগ পাবেন কি না। ২০২০ সালের বিখ্যাত বিনিতা শর্মা বনাম রাকেশ শর্মা মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দেয়—কন্যাদের এই অধিকার জন্মসূত্রে অর্জিত। সংশোধনের দিন বাবা জীবিত ছিলেন কি না, তা এই ক্ষেত্রে বিবেচ্য নয়।
২. বাবার নিজের কেনা সম্পত্তির ক্ষেত্রে কী নিয়ম?
বাবার মালিকানাধীন সব সম্পত্তিই কিন্তু পৈতৃক সম্পত্তি নয়। বাবা যদি নিজের আয়ের টাকায় জমি, বাড়ি বা ফ্ল্যাট কিনে থাকেন (Self-acquired Property), তবে সেটির ওপর তাঁর সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অধিকার থাকে।
-
নিজের কেনা সম্পত্তির ক্ষেত্রে বাবা জীবদ্দশায় বৈধ উইল করে নিজের ইচ্ছামতো কাউকে দিয়ে যেতে পারেন।
-
বাবা চাইলে তাঁর এই স্ব-অর্জিত সম্পত্তি কেবল এক সন্তানকে লিখে দিতে পারেন কিংবা বাইরের কাউকে দানও করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে উইল থাকলে সন্তান হিসেবে তা দাবি করার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকে না।
৩. উইল না করে বাবা মারা গেলে কী হবে?
যদি কোনও হিন্দু ব্যক্তি উইল না করেই মারা যান (Intestate), তবে তাঁর স্ব-অর্জিত ও অন্যান্য সম্পত্তি সরাসরি হিন্দু উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী বণ্টিত হয়।
-
এ ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির ‘প্রথম শ্রেণির উত্তরাধিকারী’ (Class-I Heirs)—অর্থাৎ ছেলে, মেয়ে, স্ত্রী ও মৃত ব্যক্তির মা সমান অংশের ভাগীদার হন।
-
ফলে বাবা উইল না করে গেলে বাবার কেনা সম্পত্তিতেও ছেলে ও বিবাহিত মেয়ে সমান ভাগ পাওয়ার যোগ্য।
সামাজিক প্রথা বা পারিবারিক ধারণার চেয়ে দেশের আইন অনেকটাই পৃথক ও কঠোর। তাই পারিবারিক সম্পত্তিতে অধিকার নিয়ে কোনও জটিলতা বা টানাপোড়েন তৈরি হলে আইনি নথি ও দলিলের ধরন যাচাই করে বিশেষজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়াই শ্রেয়।