“প্রজননের সময়ে গজায় লোম!”-এই ব্যাঙের কীর্তি শুনলে চোখ কপালে উঠবে, জানুন বিস্তারিত

প্রকৃতির দুনিয়ায় এমন কিছু অদ্ভুত প্রাণী রয়েছে, যাদের কাণ্ডকারখানা দেখলে কল্পবিজ্ঞানের গল্পও হার মেনে যায়। তেমনই এক অবিশ্বাস্য ও রোমহর্ষক প্রাণী হলো মধ্য আফ্রিকার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের নদী ও ঝরনার আশপাশে দেখা মিলত ‘হেয়ারি ফ্রগ’ বা লোমশ ব্যাঙ (Trichobatrachus robustus)। দেখতে সাধারণ ব্যাঙের মতো মনে হলেও, বিপদের মুখে পড়লে এরা যে কাণ্ড ঘটায় তা যে কাউকে অবাক করবে।

উলভারিনের মতো হাড় ভেঙে অস্ত্র বের করার কায়দা

সাধারণত প্রায় ১০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা এই ব্যাঙের বছরের অধিকাংশ সময়টা সাধারণ ব্যাঙের মতোই কাটে। কিন্তু বিপদের মুখে পড়লে এই প্রাণী নিজের পায়ের হাড় ভেঙে ধারালো নখের মতো মারাত্মক অস্ত্র বের করে আনতে পারে! বিজ্ঞানের পরিভাষায় ঠিক যেন বাস্তবের উলভারিন।

কীভাবে ঘটে এই অদ্ভুত কাণ্ড? বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, বিপদের মুখে পড়লে এই ব্যাঙের পিছনের পায়ের বিশেষ পেশি ও টেন্ডন তীব্রভাবে সংকুচিত হয়। এর ফলে আঙুলের শেষ হাড়টি তার সঙ্গে যুক্ত ছোট হাড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর সেই হাড়ের অত্যন্ত ধারালো অংশটি চামড়া ভেদ করে বাইরে বেরিয়ে আসে। বিড়ালের নখের মতো দেখতে হলেও এগুলি কেরাটিন দিয়ে তৈরি কোনো সাধারণ নখ নয়—এগুলি পুরোপুরি ওই ভাঙা হাড়েরই অংশ, যা দিয়ে তারা শত্রুর মোকাবিলা করে এবং আত্মরক্ষা করে। ক্যামেরুনের স্থানীয় মানুষ এই ব্যাঙ খাবারের জন্য শিকার করলেও, এই ধারালো নখের আঘাত থেকে বাঁচতে তাঁরা বিশেষ করে বর্শা বা দা ব্যবহার করেন। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, বিপদ কাটলে বা প্রয়োজন ফুরোলে সেই ক্ষত সেরে যায় এবং বেরিয়ে থাকা হাড় আবার আগের মতো শরীরের ভেতরে ঠিকঠাক জায়গায় ফিরে যায়। সময়ের সঙ্গে ত্বক, পেশি ও টেন্ডনও সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে।

হেয়ারি ফ্রগের গায়ে কেন গজায় লোম?

এই ব্যাঙের নামের সঙ্গে ‘হেয়ারি’ বা লোমশ শব্দটি থাকলেও, স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মতো এদের শরীরে কোনো প্রকৃত লোম থাকে না। প্রজননের মরশুমে পুরুষ ব্যাঙের দেহের দুই পাশ ও উরুতে সরু সরু সুতোর মতো অংশ গজায়, যেগুলিকে দেখতে লোমের মতো লাগে।

এর নেপথ্যেও রয়েছে এক আকর্ষণীয় কারণ। স্ত্রী ব্যাঙ ডিম পাড়ার পরে পুরুষ ব্যাঙগুলিই সেই ডিম পাহারা দেয়। ডিমগুলি সাধারণত জলের নীচে পাথরের গায়ে আটকে থাকে। দ্রুত স্রোতের জলে ডিম পাহারা দেওয়ার সময়ে বারবার জলের উপরে উঠে শ্বাস নেওয়া অত্যন্ত কঠিন। তাই জলের মধ্যেই যাতে এই ব্যাঙগুলি সহজে শ্বাসকার্য চালাতে পারে, সে জন্যই তাদের দেহে এই লোমের মতো অংশগুলির উদ্ভব হয়। প্রকৃতির এই অপূর্ব ও রহস্যময় সৃষ্টি আজও বিজ্ঞানীদের কাছে এক বড় বিস্ময়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *