কোটি টাকার অফার ফিরিয়েও যে নীতিতে অটল ছিলেন নানা পাটেকর, আজও তা বলিউডে বিরল!

ভারতীয় চলচ্চিত্রে এমন হাতেগোনা কয়েকজন অভিনেতা আছেন যাঁরা স্টারডমের চাকচিক্যের কাছে কখনও মাথা নত করেননি, নিজের শিল্পের সঙ্গে আপস করেননি। কিংবদন্তি অভিনেতা নানা পাটেকর ছিলেন সেই বিরল প্রতিভাদের একজন। পাঁচ দশক দীর্ঘ তাঁর বর্ণাঢ্য চলচ্চিত্র জীবনে তিনি কেবল পর্দায় মুখ দেখানোর জন্য বা মোটা অঙ্কের পারিশ্রমিকের লোভে কোনো ছবিতে সই করেননি। তাঁর ছবির ঝুলি হয়তো খুব দীর্ঘ নয়, কিন্তু প্রতিটি চরিত্রই আজও দর্শকদের মনে ইতিহাস হয়ে রয়েছে। অতীতে টিভি৯-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে নানা পাটেকর প্রকাশ করেছিলেন তাঁর চলচ্চিত্র নির্বাচনের পেছনের সেই ৪টি কঠোর নিয়ম, যেগুলোকে তিনি সবসময় তাঁর কাজের ‘লক্ষ্মণরেখা’ হিসেবে মেনে চলতেন।

১. অভিনেতা নন, আগে হন সাধারণ দর্শক নানা পাটেকরের প্রথম এবং সবচেয়ে মৌলিক নীতি ছিল—গল্প শোনার সময় তারকাখ্যাতির মোহ থেকে নিজেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন রাখা। তিনি একবার বলেছিলেন, “আমি যখন কোনো গল্প শুনি, তখন অভিনেতা হিসেবে শুনি না। আমি শুনি একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে, প্রেক্ষাগৃহের একজন সাধারণ দর্শক হিসেবে। গল্পটি যদি একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে আমার হৃদয় ছুঁয়ে যায়, আমাকে হাসায় বা কাঁদায়, কেবল তখনই আমি এ বিষয়ে এগিয়ে যাই।” তাঁর মতে, গল্পে সারবত্তা না থাকলে কোনো বড় তারকার চাকচিক্যও তাকে বাঁচাতে পারে না।

২. পরিচালকের দূরদৃষ্টি ও সততা যাচাই গল্প পছন্দ হওয়ার পর নানা পাটেকরের দ্বিতীয় মাপকাঠি ছিল পরিচালক নিজে। যিনি গল্পটি পর্দায় রূপায়ণ করতে চলেছেন, আবেগগুলোকে জীবন্ত করে তোলার মতো দূরদৃষ্টি তাঁর আছে কি না, তা তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখতেন। নানা বিশ্বাস করতেন, একজন দুর্বল পরিচালক সেরা চিত্রনাট্যকেও পুরোপুরি মাটি করে দিতে পারেন। তাই পরিচালকের উদ্দেশ্য ও কাজের ওপর আস্থা রাখাটা তাঁর কাছে বাধ্যতামূলক ছিল।

৩. সহ-অভিনেতা ও টিমের শক্তি নানা কখনো একক কৃতিত্বে বিশ্বাস করতেন না। তাঁর তৃতীয় নিয়ম ছিল সহ-অভিনেতাদের মান বিচার করা। তিনি প্রায়ই বলতেন, ক্রিকেটে কেবল ওপেনারের সেঞ্চুরিই ম্যাচ জেতায় না, শেষ ওভারে এসে ছোট অথচ কার্যকরী রান করে যাওয়া ব্যাটারটির ভূমিকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অপর প্রান্তের অভিনেতা শক্তিশালী হলেই যে নিজের সেরাটা উজাড় করে দেওয়া যায়, এই তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন তিনি।

৪. অর্থ ছিল সবসময় তালিকার একেবারে শেষে আজকের দিনে অনেক তারকাই চিত্রনাট্যের আগে তাঁদের পারিশ্রমিক, ভ্যানিটি ভ্যান কিংবা বিলাসবহুল চাহিদাকে প্রাধান্য দেন। কিন্তু নানা পাটেকরের ক্ষেত্রে টাকা সবসময়ই ছিল তালিকার একেবারে নিচে। তাঁর কাছে চলচ্চিত্র কখনোই শুধু আয়ের উৎস ছিল না, বরং তা ছিল আত্মিক সাধনা। টাকার চেয়ে শিল্পকে সবসময় বেশি গুরুত্ব দেওয়ার এই নীতিই নানা পাটেকরকে অন্য দশজন তারকার থেকে আলাদা করে তুলেছিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *