বার্ষিক প্রায় ১০ কোটি টাকা হিসেবে গত ১২ বছরে কমিটি চালাতে প্রায় ১২০ কোটি টাকারও বেশি সরকারি অর্থ খরচ হয়ে গিয়েছে

অ্যাসেট ডিসপোজাল কমিটির পর এবার চিটফান্ড মামলার জট কাটাতে গঠিত বিচারপতি এসপি তালুকদার কমিটির কার্যপদ্ধতি ও আর্থিক হিসাব নিয়ে তীব্র অসন্তুষ্ট ও ক্ষোভ প্রকাশ করল কলকাতা হাইকোর্ট। দীর্ঘ ১২ বছর ধরে এই কমিটি ঠিক কী কাজ করেছে এবং জনগণের রাজকোষের কোটি কোটি টাকা কীভাবে ব্যয় হয়েছে, তা নিয়ে কড়া পর্যবেক্ষণ জানিয়েছে আদালতের বিশেষ ডিভিশন বেঞ্চ।

১২ বছরে খরচ ১২০ কোটি, পেমেন্ট মাত্র ৯৬ কোটি!

বৃহস্পতিবার কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি রাজর্ষি ভরদ্বাজ ও বিচারপতি সুদীপ দেবের ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়েছে, চিটফান্ডে প্রতারিত সাধারণ মানুষের টাকা ফেরানোর নামে গত ১২ বছর ধরে বিপুল অঙ্কের সরকারি অর্থ নষ্ট হচ্ছে।

আদালতের পেশ করা হিসাব অনুযায়ী:

  • কমিটিতে ২৪ জন স্থায়ী কর্মী ও ১৩ জন ডেটা এন্ট্রি অপারেটর সহ বড় পরিকাঠামো রয়েছে।

  • বার্ষিক প্রায় ১০ কোটি টাকা হিসেবে গত ১২ বছরে কমিটি চালাতে প্রায় ১২০ কোটি টাকারও বেশি সরকারি অর্থ খরচ হয়ে গিয়েছে।

  • অথচ দীর্ঘ এই এক দশকে প্রতারিত আমানতকারীদের সর্বসাকুল্যে ফেরত দেওয়া সম্ভব হয়েছে মাত্র ৯৬ কোটি টাকা!

ক্ষুব্ধ আদালতের স্পষ্ট মন্তব্য, জনগণের করের বা রাজকোষের অর্থ খরচ করে যদি কাজের ফলাফল এই হয়, তবে তা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা যায় না। কমিটির হাতে যথেষ্ট আইনি ক্ষমতা রয়েছে, যা সঠিক উপায়ে প্রয়োগ করে দ্রুত অর্থ ফেরতের কাজ শেষ করতে হবে। আগামী ১৯শে নভেম্বরের পরবর্তী শুনানিতে কমিটিকে তাদের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ও পূর্ণাঙ্গ হিসাবের রিপোর্ট জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।

আদালতের তোলা ৩টি মেগা প্রশ্ন

শুনানি চলাকালীন তালুকদার কমিটির ভূমিকা নিয়ে মূলত তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক প্রশ্ন তুলেছেন বিচারপতিরা:

১. কোম্পানির সঠিক তালিকা ও চিহ্নিতকরণ: এখনও পর্যন্ত যে ১০৩টি সংস্থার নাম জমা পড়েছে, তাদের আদতে মোট কতটি সাব-কোম্পানি বা অঙ্গসংস্থা রয়েছে (যেমন একা রোজভ্যালিরই ৫৪টি কোম্পানি ছিল), তা আগে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে। ২. সম্পত্তি শনাক্ত ও সুরক্ষা: ওই সমস্ত চিটফান্ড সংস্থার মোট সম্পত্তির সঠিক পরিমাণ কত, তা দ্রুত নির্ধারণ করতে হবে। সম্পত্তি চিহ্নিত না করলে তা হাতবদল বা বিক্রি হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। উদাহরণের টানে আদালত জানায়, ডুয়ার্সে ‘ভিবজিওর’ (Vibgyor)-এর প্রায় ৫৪ কোটি টাকার সম্পত্তি কমিটির আওতাধীন থাকা সত্ত্বেও ২০২৫ সালে তা বিক্রি হয়ে গিয়েছে এবং অভিযোগ পেয়েও কমিটি কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়নি। ৩. আমানতকারীদের সঠিক হিসাব: মোট কত লক্ষ আমানতকারী টাকা রেখেছিলেন এবং কতজন নির্দিষ্ট আবেদন করেছেন, তার সঠিক তালিকা বানিয়ে আনুপাতিক হারে টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করতে হবে।

গরিব খেটে খাওয়া মানুষের টাকাই অগ্রাধিকার

আদালত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, কোনো প্রভাবশালী বা বড় আমানতকারীর বিশেষ সুবিধার জন্য হাইকোর্ট এই কমিটি গঠন করেনি। ৫ হাজার বা ১০ হাজার টাকা জমিয়ে সর্বস্ব হারানো নিম্ন ও মধ্যবিত্ত সাধারণ আমানতকারীদের কষ্টে অর্জিত অর্থ ফেরত দেওয়াই আদালতের একমাত্র অগ্রাধিকার। বড় আমানতকারীরা নিজেদের স্বার্থে আইনজীবী নিয়োগ করতে সক্ষম হলেও, সাধারণ মানুষ তা পারেন না—তাই তাঁদের নিঃস্বার্থ আইনি সুরক্ষা দেওয়ার সম্পূর্ণ দায়িত্ব আদালতেরই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *