ছাত্র আন্দোলনে ফের উত্তাল ফ্রান্স, জেনেনিন কী ঘটবে ৬ অক্টোবর?

শিক্ষাব্যবস্থার বেহাল দশা এবং শিক্ষক সংকটের প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে ফ্রান্স। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ দিনকে দিন যেভাবে হিংসাত্মক রূপ নিয়েছে, তাতে রীতিমতো থমকে গেছে দেশটির জনজীবন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইতোমধ্যে প্রায় চার শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে ফরাসি সরকার। এর মধ্যেই আগামী ৬ অক্টোবর দেশজুড়ে আরও বড় পরিসরে অবস্থান কর্মসূচি ও বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। সব মিলিয়ে এক টানটান উত্তেজনা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে পুরো ফ্রান্সে।

প্যারিসের দক্ষিণ-পূর্বে ক্রেতে এলাকার একটি স্কুল থেকে শিক্ষক সংকট ও বেহাল পরিকাঠামোর প্রতিবাদে এই ছাত্র আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল। মুহূর্তের মধ্যে সেই আগুন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে দেশটির অন্তত এক ডজন শহরে। তবে গত কয়েক দিনে সেই আন্দোলন শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের গণ্ডি ছাড়িয়ে মারাত্মক সহিংস রূপ নেয়। প্যারিসের বিভিন্ন স্কুলের সামনে পুড়ে যাওয়া স্কুটার, আবর্জনার স্তূপ এবং উল্টে ফেলা সুপার মার্কেটের ট্রলির ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে খোদ পুলিশের সঙ্গেই খণ্ডযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন বিক্ষুব্ধ ছাত্র-ছাত্রীরা।

বন্ধ ৪০০ স্কুল, হাজার হাজার গ্রেফতার

পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হওয়ায় গত ২ অক্টোবর ফরাসি প্রশাসন জরুরি ভিত্তিতে প্রায় ৪০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়। গত এক সপ্তাহের সহিংস সংঘর্ষে ১৭০ জন শিক্ষার্থীসহ মোট ২৩৫ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। বাদ যাননি শিক্ষক ও স্কুলকর্মীরাও। ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু একদিনেই ১,৯৪৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যাঁদের বেশিরভাগেরই বয়স ১৫ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। সংঘাতে প্রায় তিন শতাধিক পুলিশ সদস্যও আহত হয়েছেন। বিচারমন্ত্রী জেরাল্দ দারমানাঁ আশঙ্কা প্রকাশ করে জানিয়েছেন, ছুটির দিনগুলিতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

ঠিক কী দাবি শিক্ষার্থীদের?

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নতুন কিছু নয়, তবে এবারের ক্ষোভের প্রধান কারণগুলো বেশ গুরুতর:

  • দীর্ঘ ক্লাস ও অতিরিক্ত পড়ার চাপ কমানো।

  • বিদ্যালয়গুলিতে তীব্র শিক্ষক সংকট দূর করা এবং দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ।

  • পড়াশোনার উপযুক্ত ও উন্নত পরিবেশ তৈরি করা।

উত্তর ফ্রান্সের আরাস শহরের একটি ব্যানারে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ফুটিয়ে তুলে লেখা হয়েছিল— ‘সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা নয়’। এমনকি চূড়ান্ত বর্ষের ক্লাসগুলিতে পর্যাপ্ত দর্শন শিক্ষক না থাকার অভিযোগও তুলেছেন শিক্ষার্থীরা।

সংঘর্ষ ও রাজনৈতিক বিতর্ক

বিক্ষোভের জেরে পরিস্থিতি শুধু শিক্ষাঙ্গনের গণ্ডিতে আটকে থাকেনি। নঁতে শহরের একটি স্কুলের প্রবেশপথে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। এমনকি পুলিশকে লক্ষ্য করে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড ছোড়ার মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছে। অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের দমাতে পুলিশ অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এবং নির্বিচারে কাঁদানেগ্যাস ও কম প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করেছে বলে পালটা অভিযোগ তুলেছে ছাত্রছাত্রীরা।

এর মাঝেই এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক তরজা। সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, বামপন্থি দল ‘লা ফ্রঁস ইনসুমিজ’ বা এলএফআই-এর রাজনীতিকরা নিজেদের ফায়দা তুলতে শিক্ষার্থীদের এই ক্ষোভকে উসকে দিচ্ছেন। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলির দাবি, বর্তমান সরকারের ভুল অর্থনৈতিক নীতি ও বাজেট ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্তই দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে এই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং দেশের দুর্বল অর্থনীতির চাপে থাকা ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সরকারের জন্য আগামী ৬ রোববারের এই বিক্ষোভ এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে চলেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *