জোড়াতালি দেওয়া ভাঙা নৌকা থেকে এশিয়ান গেমসের রূপো! ছোটবেলার দুই বন্ধুর অবিশ্বাস্য লড়াইয়ে গর্বিত ভারত

এশিয়ান গেমস ২০২৬-এর মঞ্চে এক অভূতপূর্ব ইতিহাস সৃষ্টি করল ভারত। প্রতিযোগিতার এমন কিছু ইভেন্টে এবার পদক আসছে, যেগুলিতে অতীতে কখনও ভারতের ঝুলিতে কোনো সাফল্য আসেনি। আর এই তালিকায় স্বর্ণাক্ষরে নাম লিখিয়ে দিল সেইলিং বা নৌকা বাইচ। ছোটবেলার দুই বন্ধুর অদম্য জেদ, কঠোর পরিশ্রম এবং রূপকথার মতো কামব্যাকে ভর করে এশিয়ান গেমসের পুরুষদের স্কিফ ইভেন্টে রুপো জিতে নিলেন কেরলের মনু ফ্রান্সিস এবং প্রিন্স নোবেল কুরিসিঙ্কাল। ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক্সে নামার আগে এই সাফল্য ভারতীয় ক্রীড়ামহলের আত্মবিশ্বাস কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

কোচির চেরাই বিচ থেকে নাগোয়ার পদক মঞ্চ

এই দুই বন্ধুর সাফল্যের পেছনের গল্পটি সিনেমার চিত্রনাট্যের চেয়েও রোমাঞ্চকর। কেরলের কোচির চেরাই বিচে জোড়াতালি দেওয়া একটি সাধারণ নৌকা নিয়ে তাঁদের পথচলা শুরু হয়েছিল ক্লাস সেভেনে পড়ার সময়। ছোটবেলা থেকেই নৌকা বাইচের প্রতি তাঁদের গভীর টান ছিল। পরবর্তীতে ন্যাশনাল সেলিং স্কুলের কোচ পি মধুর নজর কাড়ার পর ভোপালে দুই বছর কঠোর প্রশিক্ষণ নেন মনু ও প্রিন্স। এরপর কেরলে ফিরে মুজিরিস ইয়টিং ক্লাবে কর্নেল নবনীত মিত্তল এবং সুরেশ পিল্লাইয়ের তত্ত্বাবধানে নিজেদের দক্ষতা আরও শাণিত করেন।

স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে বড় হওয়ার পর দুজনেই ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। কিন্তু খেলার প্রতি ভালোবাসা একটুও কমেনি। ২০২০ সাল থেকে কোচ সানদীপ জৈনের অধীনে মুম্বইয়ের আর্মি ইয়টিং নোডে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য ঘাম ঝরাতে শুরু করেন তাঁরা। ২০১০ সালের সিলভার জুবিলি ন্যাশনাল রেগাটা থেকে শুরু হওয়া তাঁদের যাত্রা আজ এশিয়ান গেমসের মহা মঞ্চ পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। এর আগে আবু ধাবি ও থাইল্যান্ডে এশিয়ান সেলিং চ্যাম্পিয়নশিপে ব্রোঞ্জ জিতলেও, এশিয়ান গেমসের অভিষেকে পদক জয় তাঁদের কেরিয়ারের অন্যতম সেরা প্রাপ্তি।

অষ্টম রেসে ধাক্কা সামলে রূপকথার কামব্যাক

এশিয়ান গেমসের এই ইভেন্টে মোট নয়টি রেস মিলিয়ে ২৩ পয়েন্ট সংগ্রহ করেছেন মনু ও প্রিন্স। এই বিভাগে ১৬ পয়েন্ট পেয়ে সোনা জিতে নিয়েছে চিনের ওয়েন জাইডিং ও লিউ তিয়ান জুটি। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিযোগিতায় প্রতিটি রেসে যে দল যে অবস্থানে শেষ করে, সেই অনুযায়ী পয়েন্ট নির্ধারিত হয়—অর্থাৎ প্রথম স্থানাধিকারী পান এক পয়েন্ট। সব রেস শেষে যার মোট পয়েন্ট সর্বনিম্ন হয়, তিনিই বিজয়ী হন।

মনু ও প্রিন্স তৃতীয় রেসে প্রথম স্থান দখল করে নিজেদের সেরার প্রমাণ দিয়েছিলেন। এছাড়া প্রথম, পঞ্চম ও নবম রেসে তাঁরা দ্বিতীয় স্থানে শেষ করেন। তবে পদক জয়ের পথটা মোটেই ফুল দিয়ে সাজানো ছিল না। অষ্টম রেসে একেবারে শেষের দিকে থাকায় কার্যত পদকের লড়াই থেকেই ছিটকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল তাঁদের। কিন্তু শেষ এবং অত্যন্ত চাপের মুহূর্তে নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দেন দুই বন্ধু। নবম তথা অন্তিম রেসে দুর্দান্ত লড়াই চালিয়ে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন তাঁরা, যা তাঁদের সগৌরবে পদকের লড়াইয়ে ফিরিয়ে আনে। শেষ পর্যন্ত ২৩ পয়েন্ট নিয়ে চিনের পরেই রুপোর পদক নিশ্চিত করেন মনু ও প্রিন্স। দুই বন্ধুর এই হার না মানা মানসিকতা এখন গোটা দেশের তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে।

Rick Sarkar
  • Rick Sarkar

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *