প্রতি বছর নতুন ফোন কেনার ভূত চেপেছে মাথায়? এই সত্যিটা না জানলে পকেট ফাঁকা হবে গ্যারান্টি!

আমি ব্যক্তিগতভাবে যতবার ফোন বদলেছি, তা যে কোনও বুদ্ধিমান মানুষের যতবার ফোন বদলানো দরকার, তার চেয়ে অনেকটাই বেশি। একের পর এক প্রজন্মের আইফোন, স্যামসাং আল্ট্রা, হাই-এন্ড গেমিং ফোন থেকে শুরু করে মাঝখানে আরও বেশ কয়েকটি অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইস—কোনোটার নতুন ক্যামেরা সিস্টেম, কোনোটার আকর্ষণীয় ডিজাইন বা হার্ডওয়্যারের চমকপ্রদ ফিচার দেখলেই আমার তা নিয়ে খেলতে ইচ্ছে করে।

কিন্তু গত কিছুদিন ধরে আমিও নিজেকে একটা অত্যন্ত অস্বস্তিকর প্রশ্ন করতে শুরু করেছি: সত্যিই কি প্রতি বছর আমাদের নতুন ফোন আপগ্রেড করার দরকার আছে?

মনে আছে, যখন নতুন ফোন সত্যিই নতুন মনে হত?
একটা সময় ছিল, যখন দু’-তিন বছর পর ফোন বদলালে তার পার্থক্যটা বেশ নাটকীয়ভাবে চোখে পড়ত। স্ক্রিন হঠাৎ অনেক ভালো হয়ে যেত, ক্যামেরা এমন দুর্দান্ত ছবি তুলত যা সত্যিই কাজে লাগত, আর প্রসেসর আগের তুলনায় চোখে পড়ার মতো দ্রুত গতির হয়ে উঠত। এরপর একে একে বাজারে এল 4G কানেক্টিভিটি, ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর, ফেস রিকগনিশন, একাধিক ক্যামেরা এবং হাই-রিফ্রেশ-রেট ডিসপ্লের মতো ফিচারগুলি, যা আক্ষরিক অর্থেই আমাদের ফোন ব্যবহারের অভিজ্ঞতা চিরতরে বদলে দিয়েছিল।

কিন্তু আজ যদি আপনি ফ্ল্যাগশিপ ফোনের পরপর দুটি প্রজন্মকে পাশাপাশি রাখেন, তবে টেবিলের অন্য প্রান্ত থেকে দেখলে কোনটি নতুন আর কোনটি পুরনো, তা আলাদা করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তাই মনে প্রশ্ন জাগে, অ্যাপল বা স্যামসাংয়ের মতো কোম্পানিগুলি কি কেবল নতুন রঙের ভ্যারিয়েন্ট বা সামান্য ডিজাইন বদল করেই আমাদের বোঝাতে চায় যে আপনি একটি প্রিমিয়াম ফোন কিনেছেন?

এর অবশ্য অন্য অর্থও রয়েছে। আসলে স্মার্টফোন এখন অত্যন্ত পরিণত একটি পণ্য। প্রতি বারো মাসে কাচের তৈরি একটি আয়তাকার ডিভাইসে নতুন করে কোনো বিশাল বিপ্লব ঘটানো একপ্রকার অসম্ভব, বিশেষ করে যখন সেই ফোনে আগে থেকেই দুর্দান্ত ডিসপ্লে, শক্তিশালী প্রসেসর এবং একাধিক অসাধারণ ক্যামেরা দেওয়া থাকছে। তবুও প্রতি বছর লঞ্চ ইভেন্টের সময় আমরা এমনভাবে মেতে উঠি, যেন এ বছরের সামান্য উন্নত টেলিফটো ক্যামেরার জন্যই গোটা সভ্যতা এতদিন ধরে অপেক্ষা করছিল!

আপনার প্রসেসর কি বসে বসে বিরক্ত হচ্ছে?
আজকের আধুনিক ফ্ল্যাগশিপ ফোনগুলো ভীষণ শক্তিশালী। কিন্তু আমাদের বেশিরভাগ ব্যবহারকারীই সেই ক্ষমতার সামান্য অংশও কাজে লাগাই না। প্রতিদিনের হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট, ইমেল, ওয়েব ব্রাউজিং, ইউটিউব, ইউপিআই লেনদেন বা সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করার মতো সাধারণ কাজের জন্য দু’-তিন বছর আগের ভালো একটি ফোনও অনায়াসে কাজ চালিয়ে দিতে পারে।

আমরা যে কোয়াককম স্ন্যাপড্রাগন বা শক্তিশালী প্রসেসরের পারমাণবিক চুল্লির মতো ক্ষমতার জন্য এত টাকা খরচ করছি, তার সিংহভাগ সময়ই সেটি বসে বসে চা খায় আর আমাদের ইনস্টাগ্রাম রিল দেখতে দেখে!

পাশাপাশি, বর্তমানের সফটওয়্যার সাপোর্টও আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে। গুগল পিক্সেল বা স্যামসাংয়ের গ্যালাক্সি এস২৬-এর মতো নতুন সিরিজগুলিতে এখন দীর্ঘ সাত বছরের ওএস এবং সিকিউরিটি আপডেট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ, ভালো একটি ফোন দীর্ঘদিন ব্যবহার করলেই যে আপনাকে পুরনো সফটওয়্যার বা সিকিউরিটির ঝুঁকিতে পড়তে হবে, এমন দিন আর নেই।

ক্যামেরা ও ব্যাটারি: ঠিক কখন বদলানো দরকার?
অবশ্য এখানে এসে আমার নিজের যুক্তিবোধ একটু নড়বড়ে হয়ে যায়। আমি যেহেতু একজন অপেশাদার ফটোগ্রাফার, তাই ক্যামেরা এখনও এমন একটি ক্ষেত্র যা আমাকে সহজে আকৃষ্ট করে। ভালো জুম, কম আলোতেও পরিষ্কার ছবি তোলার ক্ষমতা বা উন্নত ভিডিওগ্রাফি—আপনি যদি সত্যিই এগুলি ব্যবহার করেন, তবে এই পার্থক্যগুলি আপনার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পাশাপাশি ব্যাটারি লাইফও একটি বড় ফ্যাক্টর। কয়েক বছর ব্যবহারের পর অন্য দিক থেকে ভালো থাকা একটি ফোনের ব্যাটারি যদি আগের মতো দীর্ঘক্ষণ ব্যাকআপ না দেয়, তবে গোটা ফোন বদলে ফেলার আগে শুধু ব্যাটারিটা বদলেই দেখা বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে। এতে পুরো নতুন ফোন কেনার খরচের তুলনায় অনেক কম টাকায় কাজ চলে যায়।

আপনার ফোন যদি বারবার হ্যাং করে, স্টোরেজ সবসময় ফুল থাকে কিংবা নতুন কোনো গুরুত্বপূর্ণ ফিচার আপনার দৈনন্দিন কাজকে সত্যি সহজ করে দেয়, তবেই আপগ্রেড করার যুক্তি থাকে। কিন্তু ক্যালেন্ডারে সেপ্টেম্বর মাস এসে গিয়েছে বা বাজারে নতুন মডেল লঞ্চ হয়েছে বলেই চোখ বন্ধ করে ফোন বদলে ফেলা বোকামি।

এআই (AI) কি শুধুই গিমিক?
আজকাল ফোন নির্মাতারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর জুজু দেখিয়ে পুরনো হার্ডওয়্যারকে রাতারাতি প্রাগৈতিহাসিক বলে প্রমাণ করতে চাইছে। কিছু নতুন এআই ফিচারের জন্য সত্যিই শক্তিশালী প্রসেসর ও বেশি র‍্যামের প্রয়োজন হয়। কিন্তু এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমার একটি খুব সহজ নিয়ম রয়েছে: আমাকে শুধু বলবেন না যে ফোনে এআই আছে; এমন কিছু দেখান যা আমার বর্তমান ফোন করতে পারে না এবং দৈনন্দিন জীবনে সত্যিই কাজে লাগে।

যদি সেই ফিচার আমার কাজের গতি বাড়িয়ে দেয়, তবে আমি রাজি। কিন্তু যদি সেটি স্পেসস্যুট পরা ইউনিকর্নের পিঠে চড়ে থাকা আমার একটি অ্যানিমেটেড ইমোজি তৈরি করে দেয়, তবে আমি আরও এক বছর পুরনো ফোনেই দিব্যি কাটিয়ে দিতে পারব!

আসল কথাটি কী?
নতুন ফোন চাই এবং নতুন ফোন প্রয়োজন—এই দু’টি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। প্রযুক্তি যদি আপনার শখ হয়, নতুন গ্যাজেট কেনার সামর্থ্য আপনার থাকে এবং সর্বশেষ মডেলটি আপনার মুখে হাসি ফোলায়, তবে তার জন্য কোনো বৈজ্ঞানিক যুক্তি খোঁজার প্রয়োজন নেই। ঘড়ি, গাড়ি বা ভ্রমণের মতো গ্যাজেটও ভীষণ মজার হতে পারে।

তবে আপনার পরবর্তী স্মার্টফোন আপগ্রেডকে সত্যিই রোমাঞ্চকর করে তোলার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো—এত ঘন ঘন ফোন বদলানো বন্ধ করা। ফোনটি অন্তত দুই, তিন বা তার বেশি বছর ব্যবহার করুন। দেখবেন, ছোট ছোট উন্নতিগুলি একসঙ্গে জমে এমন একটি পার্থক্য তৈরি করেছে, যা আপনি হাতে-নাতে অনুভব করতে পারবেন। তখন নতুন ফোন কেনাটা সত্যি সার্থক মনে হবে!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *