অন্ত্রে বড় ফুটো, রক্তচাপ তলানিতে! কলকাতার হাসপাতালে মৃত্যুর মুখ থেকে অলৌকিকভাবে ফিরে এল ১৯ বছরের তরুণী

যক্ষ্মা, অন্ত্রে বড়সড় ফুটো, তার জেরে রক্তে মারাত্মক সংক্রমণ এবং একাধিক অঙ্গের কার্যক্ষমতা লোপ পাওয়া—একাধিক জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন মাত্র ১৯ বছরের এক তরুণী। মুর্শিদাবাদ থেকে অত্যন্ত সংকটজনক অবস্থায় তাঁকে নিয়ে আসা হয়েছিল কলকাতায়। অবশেষে চিকিৎসকদের সম্মিলিত ও অক্লান্ত লড়াইয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে অলৌকিকভাবে জীবন ফিরে পেলেন ইয়াসমিন খাতুন নামের ওই তরুণী।

কীভাবে শুরু হয়েছিল লড়াই?

চলতি বছরের মার্চ মাসেই ইয়াসমিনের ফুসফুসে যক্ষ্মা ধরা পড়েছিল। তবে নিয়মিত ওষুধ না খাওয়ার কারণে সমস্যা বাড়তে শুরু করে। এর কয়েক মাস পর হঠাৎই শুরু হয় তীব্র পেটে ব্যথা। গত ২১ অগাস্ট মুর্শিদাবাদের একটি হাসপাতালে ভর্তি করার পর পরীক্ষা করে দেখা যায়, তাঁর অন্ত্রে বড়সড় ফুটো হয়ে গেছে। অবস্থার দ্রুত অবনতি হওয়ায় তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে রেফার করা হয় কলকাতায়।

যখন তাঁকে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়, তখন তাঁর রক্তচাপ নেমে গিয়েছিল একেবারে তলানিতে (৮০/৬০)। পেটের ভেতর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় তৈরি হয়েছিল ভয়াবহ সেপটিক শক। রক্ত জমাট বাঁধার সূচক (PT/INR) বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৩.২-এ। জ্বরের পাশাপাশি তাঁর চেতনাতেও আচ্ছন্ন ভাব চলে আসে।

জটিল অস্ত্রোপচার ও পরবর্তী লড়াই

পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে জরুরি ভিত্তিতে রাতেই অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসকেরা। রক্তজাত উপাদান দিয়ে রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়া কিছুটা স্থিতিশীল করার পর শুরু হয় সার্জারি। চিকিৎসকরা দেখতে পান, ক্ষুদ্রান্ত্রের ইলিয়াম (ileum) অংশে বড় বড় ফুটো হয়েছে। ঝুঁকি নিয়ে ওই ক্ষতিগ্রস্ত অংশের প্রায় ৬০-৭০ সেন্টিমিটার বাদ দেওয়া হয় এবং ডাবল-ব্যারেল ইলিওস্টোমি করা হয়। অস্ত্রোপচারের পরই ভেন্টিলেশন থেকে বের করা সম্ভব হলেও বিপদ কাটেনি।

এর দু’দিন পরেই ফুসফুসে অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ডিসট্রেস সিনড্রোম (ARDS) দেখা দেওয়ায় তাঁকে ফের ভেন্টিলেশনে দিতে হয়। শুধু তাই নয়, সেপটিক শকের ধাক্কায় তাঁর লিভারের কার্যক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায় এবং রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা প্রায় ৩০-এ পৌঁছে যায়। অর্থাৎ শরীরের একাধিক অঙ্গ একসঙ্গে বিকল হওয়ার উপক্রম হয়েছিল।

চিকিৎসকদের মেগা টিম ও সাফল্য

সার্জারি, ক্রিটিক্যাল কেয়ার, কিডনি, পরিপাকতন্ত্র এবং সংক্রমণ বিশেষজ্ঞ—একাধিক বিভাগের চিকিৎসকদের সমন্বিত ও নিবিড় পরিচর্যা শুরু হয়। ধীরে ধীরে চিকিৎসায় সাড়া দিতে শুরু করেন ইয়াসমিন। লিভারের অবস্থার উন্নতি হয়, কমে বিলিরুবিনের মাত্রাও। অবশেষে গত ১০ সেপ্টেম্বর সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরেন তিনি। চিকিৎসকদের মতে, সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত এবং একাধিক বিভাগের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই এই ১৯ বছরের তরুণীকে মৃত্যুর মুখ থেকে ছিনিয়ে এনেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *