১৮ বছর বয়স নাকি শরিয়তের ‘বয়ঃসন্ধি’? পাকিস্তানে লাখ লাখ বাল্যবিবাহ নিয়ে রাষ্ট্রসংঘে বিস্ফোরক তথ্য ফাঁস!

পাকিস্তানে বাল্যবিবাহ ও জোরপূর্বক বিয়ের ক্রমবর্ধমান ঘটনা নিয়ে এবার রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে বিস্ফোরক উদ্বেগ প্রকাশ করল মানবাধিকার সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস ফোকাস পাকিস্তান’ (HRFP)। জেনেভায় রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের ৬৩তম অধিবেশনে সংগঠনের সভাপতি নাভিদ ওয়াল্টার পাকিস্তানের শিশু সুরক্ষা আইন ও সংখ্যালঘু মেয়েদের ওপর চলা অকথ্য নির্যাতনের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন। তাঁর এই বক্তব্যে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।

আইন বদলালেও থমকে রয়েছে বাস্তবের ছবি
প্রেস রিলিজ অনুযায়ী, সম্প্রতি পাকিস্তান সরকার ছেলে ও মেয়ে উভয়েরই বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর করার পাশাপাশি ‘পাঞ্জাব চাইল্ড ম্যারেজ রেস্ট্রেন্ট অ্যাক্ট, ২০২৬’ পাশ করেছে। কিন্তু আইন কাগজে-কলমে বদলালেও তার প্রয়োগ নিয়ে তৈরি হয়েছে বিরাট প্রশ্নচিহ্ন। নাভিদ ওয়াল্টার স্পষ্ট জানিয়েছেন, কোরান ও সুন্নাহর পরিপন্থী দাবি করে দেশের কট্টরপন্থী ও ধর্মীয় দলগুলি এই আইনের তীব্র বিরোধিতা করে চলেছে। ফলে আইনগুলির সঠিক বাস্তবায়ন নিয়ে এখন বড় পরীক্ষা শুরু হয়েছে।

বিশেষ করে ১৮ বছরের কম বয়সি মেয়েদের বিয়ের ক্ষেত্রে আইনি ধোঁয়াশা চরম আকার ধারণ করেছে। অনেক ক্ষেত্রেই বাল্যবিবাহ রোধকারী আইনের সঙ্গে ব্যক্তিগত বা শরিয়তি আইনের সরাসরি সংঘাত দেখা দিচ্ছে। মেয়েদের বয়স নির্ধারণের ক্ষেত্রে আদালতগুলিও ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান নিচ্ছে। সরকারি নথিপত্র ও ‘নাডরা’ (NADRA) রেকর্ডের বড় ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও অনেক বিচারক এখনও প্রাচীন ইসলামি আইন বা ‘বয়ঃসন্ধি’-র ওপর ভিত্তি করে রায় দিচ্ছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

ইউনিসেফের চাঞ্চল্যকর পরিসংখ্যান ও সংখ্যালঘুদের দুর্দশা
ইউনিসেফের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান তুলে ধরে ওয়াল্টার জানান, বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বাল্যবধূর বাস পাকিস্তানে। সেখানে লাখ লাখ মেয়ের বয়স আঠারো বছর হওয়ার আগেই জোর করে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। সংবাদমাধ্যম বা আদালতের চৌকাঠ পর্যন্ত যতগুলো ঘটনার তথ্য পৌঁছায়, তার প্রকৃত সংখ্যাটা এর চেয়ে বহুগুণ বেশি।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দুর্দশা নিয়ে সরব হয়ে তিনি বলেন, “যে ঘটনার কোনো নথি নেই, তার বিচারও হয় না।” ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাবালিকা মেয়েদের অপহরণ, জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ এবং বাল্যবিবাহের মতো ঘটনা সেখানে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি অভিযোগের কঠোর ও নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি শিশুর মৌলিক অধিকার রক্ষাকেই সর্বাগ্রে স্থান দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

প্রশাসনের কড়া পদক্ষেপের সুপারিশ
পাকিস্তান প্রশাসনের কাছে একাধিক সুনির্দিষ্ট দাবি জানিয়েছে এইচআরএফপি। এর মধ্যে রয়েছে—

বিয়ের রেজিস্ট্রেশনের আগে সিএনআইসি (CNIC), বি-ফর্ম এবং নাডরা রেকর্ডের মাধ্যমে প্রার্থীর বয়স যাচাই বাধ্যতামূলক করা।

প্রতি বছর বাল্যবিবাহ সংক্রান্ত অভিযোগ, এফআইআর, বিচার ও শাস্তির পরিসংখ্যান প্রকাশ করা।

জোরপূর্বক বিয়ের শিকার হওয়া শিশুরা যাতে আইনি সাহায্য পায়, তার জন্য ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আইনগুলির মধ্যে দ্রুত সামঞ্জস্য আনা।

পাশাপাশি, জিএসপি প্লাস (GSP+)-এর মতো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও বাণিজ্য সংক্রান্ত পর্যালোচনার মাধ্যমে পাকিস্তানের বাল্যবিবাহ রোধ আইনের ওপর কড়া নজরদারি চালানোর জন্য আন্তর্জাতিক মহলের কাছে জোরালো আবেদন জানানো হয়েছে। বক্তব্যের শেষে ওয়াল্টার বলেন, শিশু ও পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের সুরক্ষায় তাঁদের এই লড়াই অব্যাহত থাকবে এবং লিখিত আইনগুলিকে রক্ষা করার জন্য বিশ্ববাসীকেও সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *