কর্মীদের স্বাস্থ্যের পেছনে কোটি কোটি টাকা ওড়াচ্ছে অফিস! খরচ বাড়লেও এই চালে কীভাবে মোটা টাকা বাঁচছে কোম্পানির?

দ্রুত বদলে চলেছে কর্পোরেট সংস্কৃতির চেনা ছবি। একটা সময় ছিল যখন সংস্থাকর্তারা কর্মীদের কেবল সাধারণ স্বাস্থ্য বীমা বা মেডিকেল ইনসিওরেন্স দিয়েই নিজেদের দায় সারতেন। কিন্তু সেই দিন আর নেই। বর্তমানে অফিসগুলির অন্দরে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা (Mental Health Support), টেলিহেলথ পরামর্শ থেকে শুরু করে প্রিভেন্টিভ হেলথ চেকআপ এবং জিম সদস্যপদের মতো প্রিমিয়াম সুবিধা দেওয়ার ধুম পড়েছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে যে কর্মচারীদের খুশি রাখতে জলের মতো অর্থ খরচ করছে কোম্পানিগুলি। কিন্তু এর নেপথ্যে রয়েছে এক সুদূরপ্রসারী ও সুদৃঢ় আর্থিক পরিকল্পনা। সম্প্রতি কর্মচারী স্বাস্থ্য সুবিধা প্ল্যাটফর্ম ‘প্লাম’ (Plum)-এর একটি চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক অভাবনীয় তথ্য। সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, কর্মীদের স্বাস্থ্যের পেছনে করা এই খরচ কোনো দাতব্য বা অনুদান নয়, বরং এটি একটি সুচিন্তিত বিনিয়োগ যা দীর্ঘমেয়াদে কোম্পানিগুলির পকেট ভারী করছে।

প্রতি কর্মচারীতে বড় অংকের সাশ্রয়

প্লাম-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্পোরেট স্বাস্থ্য সংক্রান্ত পুরোনো এবং গতানুগতিক পদ্ধতিগুলির কার্যকারিতা ফুরিয়েছে। কোম্পানিগুলি এখন আর কর্মী অসুস্থ হয়ে পড়ার জন্য অপেক্ষা করে না। যে সমস্ত সংস্থা টেলিহেলথ, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা প্রাথমিক রোগ নির্ণয়ের মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় টাকা ঢালছে, তারা গুরুতর ও দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার ক্ষেত্রে বীমা দাবির পরিমাণ ১৩% পর্যন্ত কমিয়ে আনতে পেরেছে।

এর সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে কোম্পানির আর্থিক খতিয়ানে। এর ফলে প্রিমিয়াম বাবদ সংস্থাগুলি প্রতি কর্মীর জন্য প্রায় ৪৮০ টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় করছে। অর্থাৎ, ১,০০০ জন কর্মী রয়েছে এমন কোনো মাঝারি বা বড় মাপের কোম্পানির ক্ষেত্রে এই সাশ্রয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা (প্রায় ৫ লক্ষ টাকা)। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সুবিধা কোনো সাময়িক নয়, বরং আগামী তিন বছরে এই বার্ষিক সাশ্রয় ৬% হারে আরও বৃদ্ধি পাবে।

সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার প্রতিযোগিতায় রেকর্ড বৃদ্ধি

গত চার বছরে কর্পোরেট দুনিয়ায় স্বাস্থ্য সুরক্ষা দেওয়ার মানসিকতায় বিপ্লব এসেছে। প্লাম-এর প্রতিবেদনে যে তথ্যগুলি প্রকাশ্যে এসেছে, সেগুলি হলো:

উন্নত মানের সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী নিয়োগকর্তার সংখ্যা ৫% থেকে একলাফে বেড়ে হয়েছে ২৩%। এখন প্রতি চারটি কোম্পানির মধ্যে প্রায় একটি সংস্থা ব্যাপক সুরক্ষা ব্যবস্থা দিচ্ছে।

৫ লক্ষ টাকার বেশি বীমা রাশি প্রদানকারী কোম্পানির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ৫৩%।

৭৫,০০০ টাকার বেশি মাতৃত্বকালীন (Maternity) সীমা প্রদানকারী কোম্পানির সংখ্যা ১৫৫% বৃদ্ধি পেয়েছে।

মেয়াদী জীবন বীমা (Term Life Insurance) প্রদানকারী কোম্পানির সংখ্যা বেড়েছে ১৭৯%।

প্লাম-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং সিইও অভিষেক পোদ্দার জানিয়েছেন, ভারতে কর্মীদের সুবিধা আগে কেবল কাগজে-কলমে বীমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমানের সেরা কোম্পানিগুলি কোনো বিপদ বা দাবি উত্থাপনের আগেই কর্মীদের স্বাস্থ্যসেবার দিকে নজর দিচ্ছে। কর্পোরেট চিন্তাভাবনায় এটি এক যুগান্তকারী পরিবর্তন।

প্রথমবারের মতো মিলছে প্রিভেন্টিভ কেয়ারের সুবিধা

কোম্পানিগুলির এই সময়োপযোগী পদক্ষেপে দেশের এক বিশাল অংশের কর্মীরা প্রথমবারের মতো উন্নত স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন। তথ্য বলছে, কোম্পানির সুবাদেই ৬১ শতাংশ কর্মী স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুযোগ নিয়েছেন, ৭৪ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা পেয়েছেন এবং ৩১ শতাংশ মানুষ জীবনে প্রথমবার জিমের সদস্যপদ উপভোগ করেছেন। শুধু কর্মীরাই নন, তাঁদের পরিবারও এই সুবিধার সুফল পাচ্ছে। মোট চিকিৎসাগত পরামর্শের ৩৭ শতাংশ এবং বহির্বিভাগীয় (OPD) চিকিৎসার ২৪ শতাংশ দাবিই আসছে কর্মীদের পরিবারগুলির তরফ থেকে।

ভবিষ্যতে কি খরচ আরও বাড়তে পারে?

প্লাম-এর সিটিও সৌরভ অরোরার মতে, কোম্পানিগুলির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিশ্চিত করা যে কর্মীরা প্রদত্ত সুবিধাগুলির শতভাগ ব্যবহার করছেন। এই সুবিধাগুলির অভিজ্ঞতা যত উন্নত হবে, কর্মীদের স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে ‘জেভনস প্যারাডক্স’-এর প্রভাব তত দৃশ্যমান হবে। এর সহজ অর্থ হলো, কর্মীরা যত বেশি স্বাস্থ্য সুবিধা ব্যবহার করবেন, প্রাথমিক পর্যায়ে কোম্পানিগুলির চিকিৎসাগত খরচ কিছুটা বাড়তে পারে।

বর্তমানে ভারতের ৪০ শতাংশেরও কম মানুষ কোনো না কোনো স্বাস্থ্য বীমার আওতাভুক্ত এবং এখানকার প্রিমিয়ামের হার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত বাজারের তুলনায় বেশ কম। তা সত্ত্বেও ভারতে গোষ্ঠীভিত্তিক স্বাস্থ্য বীমা (Group Health Insurance) বার্ষিক ২৩ শতাংশ হারে লাফিয়ে বাড়ছে। সব মিলিয়ে, এই প্রতিবেদনে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় প্রমাণ করে দেওয়া হয়েছে যে, নিজের সুস্থ ও কর্মক্ষম কর্মীবাহিনীর পেছনে করা এই বিনিয়োগ কোনো লোকসানের सौदा নয়। বরং কর্মীরা সুস্থ থাকলে তাঁদের উৎপাদনশীলতা যেমন বহুগুণ বাড়ে, তেমনই দিনশেষে তা কোম্পানির বড় অংকের অর্থ বাঁচিয়ে দেয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *