‘শিবসেনার মতো দশা হবে?’ প্রতীক কাণ্ডে কমিশনকে সুপ্রিম কোর্টের চরম প্রশ্ন! ধাক্কা খেল নব তৃণমূলও?

তৃণমূল কংগ্রেসের নাম এবং দলীয় প্রতীক ‘জোড়াফুল’ ব্যবহারের ওপর জাতীয় নির্বাচন কমিশনের দেওয়া অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বৃহস্পতিবার সর্বোচ্চ আদালতে সেই হাইভোল্টেজ মামলার শুনানিতে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে উঠল একগুচ্ছ প্রশ্ন। বিবাদ নিষ্পত্তিতে কতদিন সময় লাগবে, তা আগামী সোমবারের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টকে স্পষ্ট জানানোর নির্দেশ দিয়েছে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির বেঞ্চ।

‘ইচ্ছাকৃত সিদ্ধান্ত কমিশনের’, এজলাসে সরব কপিল সিবাল

শুনানির শুরুতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী কপিল সিবাল আদালতকে জানান, নির্বাচন প্রক্রিয়া চলাকালীন কমিশন জেনে-বুঝে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সিবালের সওয়াল, “আমরা নির্বাচন স্থগিত করার আবেদন জানাচ্ছি না। কিন্তু জুন মাস থেকে এই বিতর্ক চলছে। আমরা জুলাইতেই আমাদের বক্তব্য জানিয়েছি। অথচ কমিশন জুলাই মাসে সিদ্ধান্ত না দিয়ে নির্বাচনের মুখে নাম ও প্রতীক ফ্রিজ করল, যাতে আমাদের হাতে আইনি প্রতিকার (Remedy) পাওয়ার মতো সময় না থাকে। নিয়ম যদি এটাই হয়, তবে কমিশনকে অন্তত একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হোক।” সিবাল এবং কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় নভেম্বরের উপনির্বাচনের আগেই অক্টোবরের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানান।

‘শিবসেনা মামলার পরিণতি দেখেছেন তো?’ কমিশনকে সতর্ক করল আদালত

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবেদনের জবাবে অরূপ রায়ের নেতৃত্বাধীন ‘ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেস’-এর আইনজীবী মুকুল রোহতগি জানান, অক্টোবরের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া কমিশনের পক্ষে অতিরিক্ত চাপ হয়ে যাবে। উদাহরণ হিসেবে তিনি শিবসেনা বা এআইএডিএমকে (AIADMK) মামলার প্রসঙ্গ তোলেন।

তাতেই পাল্টা মন্তব্য করেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি। তিনি বলেন, “শিবসেনা মামলার ক্ষেত্রে সময় নেওয়ার পরিণতি কী হয়েছিল, তা আমরা সবাই দেখেছি।” একই সঙ্গে বিচারপতি ভি মোহনা বিদ্রোহী শিবিরকে প্রশ্ন করেন, “আপনারাও তো প্রতীকের দাবিদার, তবে দ্রুত নিষ্পত্তি চান না কেন?”

নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী ডিএস নাইডু জানান, দু’টি পক্ষ একই প্রতীক চাওয়ায় কমিশন অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিস্তারিত শুনানি ও প্রমাণ জমা নেওয়ার প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ। তবে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত কমিশনকে নির্দেশ দেন—দলীয় প্রতীক ও নাম সংক্রান্ত বিরোধ মেটাতে ঠিক কতদিন সময় লাগবে, তা কমিশনের থেকে জেনে সোমবার সুপ্রিম কোর্টকে জানাতে হবে।

গর্জে উঠলেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়

আদালতের বাইরে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন প্রবীণ তৃণমূল নেতা তথা সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “যা ঘটছে তাতে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন উঠছে। দরকার হলে সরকার সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকুক, সেখানে দেশের মানুষ বুঝে যাবে নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে বিরোধীদের মনোভাব কী।”

প্রেক্ষাপট: ঠিক কী ঘটেছিল ১৮ সেপ্টেম্বর?

গত ১৮ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন এক অন্তর্বর্তী নির্দেশে ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং ‘জোড়াফুল’ প্রতীকের ব্যবহার সাময়িকভাবে স্থগিত করে। দলে দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠী (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শিবির ও অরূপ রায় শিবির) তৈরি হওয়ায় কমিশন এই পদক্ষেপ নেয়।

অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন নতুন নামকরণ হয় ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ (প্রতীক: ফুটবল খেলোয়াড়) এবং অরূপ রায়ের নেতৃত্বাধীন শিবিরের নাম হয় ‘ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেস’ (প্রতীক: খাম)। কিন্তু উপনির্বাচনের আগে নিজেদের আদি পরিচয় ফিরে পেতে এখন আইনি লড়াই লড়ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী শুনানির দিকেই এখন তাকিয়ে রাজ্য রাজনীতির সমীকরণ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *